আইন করে বন্ধ করা উচিত পরিবহন নৈরাজ্য

ফাইল ছবি

অনলাইন ডেস্কঃ আইন করে পরিবহন খাতের নৈরাজ্য বন্ধ করা উচিত বলে মনে করেন এ খাতের বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, প্রতিদিন এ নৈরাজ্যের কারণে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি হচ্ছে, অন্যদিকে ব্যবসা-বাণিজ্য ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দাম বেড়ে যাচ্ছে নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেতে সংকটে পড়ছে সাধারণ শিক্ষার্থীরা। শুধু তাই নয়, নৈরাজ্যের ধর্মঘটে রপ্তানি বাণিজ্য পুরোপুরি বন্ধ হয়ে পড়েছে। এই প্রেক্ষাপটে পরিবহন ধর্মঘটের নামে দেশব্যাপী নজিরবিহীন নৈরাজ্য আইন করে বন্ধ করা উচিত বলেন মনে করেন আইনজীবী, ব্যবসায়ীসহ দেশের সাধারণ মানুষ। তারা বলেছেন, ধর্মঘটের নামে পরিবহন শ্রমিকরা সাধারণ মানুষকে সীমাহীন হয়রানি করেছে। তাদের চলাচলে বাধা দিয়েছে ও হামলা করেছে। তাদের প্রচলিত আইনে কঠোর শাস্তি দেওয়ার পাশাপাশি প্রয়োজনে নৈরাজ্যের বিরুদ্ধে নতুন করে আইন করা উচিত। পরিবহন শ্রমিকদের ৪৮ ঘণ্টার ধর্মঘটে যানবাহন না পেয়ে যারা নিজেদের প্রাইভেটকারসহ বিকল্প যানবাহনে যাতায়াতের চেষ্টা করেছেন তারা হামলা, ভাঙচুর ও নাজেহালের শিকার হয়েছেন। ধর্মঘটের কারণে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ভয়ঙ্কর ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। রোগী, শিশু ও নারীরা সীমাহীন দুর্ভোগে পড়েছেন। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা স্থবির হয়ে পড়েছে। অনেক জায়গায় গাড়ির চালক ও ছাত্রীদের গায়ে পোড়া মবিল লেপ্টে দেওয়া হয়েছে। হবিগঞ্জে লাশের গাড়ি আটকে চালককে মারধর করা হয়েছে। পরিবহন শ্রমিকদের এমন নৈরাজ্যের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী প্রতিবাদের ঝড় বইছে। উল্লেখ্য, দেশজুড়ে সড়ক দুর্ঘটনা বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে যেখানে ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়ার যোগ্যতা অষ্টম শ্রেণি থেকে এসএসসি পাস করার দাবি উঠেছে সেখানে ধর্মঘটি শ্রমিকরা তাদের দাবির মধ্যে লাইসেন্স পাওয়ার যোগ্যতা পঞ্চম শ্রেণিতে নামিয়ে আনারও দাবি করছে। পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতি— বিজিএমইএ সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান বলেন, এই নৈরাজ্য সৃষ্টিকারীদের কাছে আমার প্রশ্ন হলো— সংসদে যখন সড়ক আইনটি পাস হয়, তখন এরা কোথায় ছিল। এখন আইন পাস হওয়ার পর মানুষ, ব্যবসা-বাণিজ্য জিম্মি করে পরিবহন ধর্মঘট কাম্য না। এই দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। দেশে এখন একটি স্বাভাবিক পরিবেশ বিরাজ করছে। এখন মানুষ জিম্মি করে ভাঙচুর ও পরিবহন ধর্মঘট চলবে না। তাই দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে হলে, নৈরাজ্যকর পরিবহন ধর্মঘট বন্ধে নতুন আইন করা উচিত। বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশন— এফবিসিসিআইর সাবেক সহসভাপতি মো. হেলাল উদ্দিন বলেন, পরিবহন শ্রমিকরা দুই দিন যাবৎ ধর্মঘটের নামে দেশে একটি নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। দেশ, জাতি ও অর্থনীতির স্বার্থে পরিবহন ধর্মঘট বন্ধে নতুন আইন প্রণয়নের প্রয়োজন আছে। কারণ, নৈরাজ্যকর পরিবহন ধর্মঘটে ভোগ্যপণ্যের দাম বাড়ে। রপ্তানি পণ্য পরিবহন ব্যাহত হয়। জরুরি আমদানি পণ্য সরবরাহে ঘাটতি দেখা দেয়। তাই দেশের অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য এগিয়ে নিতে এবং নৈরাজ্যকর পরিবহন ধর্মঘট বন্ধে আইন প্রণয়ন ও আইনের কঠোর প্রয়োগ চাই। বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতি— বিকেএমইএর সাবেক প্রথম সহসভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, পরিবহন ধর্মঘট বন্ধে নতুন আইন তৈরির বিকল্প নেই। এই ধরনের নৈরাজ্য জনগণ মেনে নিতে পারে না। জনগণকে জিম্মি করে এই ধরনের ধর্মঘট বন্ধে আইন তৈরি করতে হবে। আইনে কঠোর শাস্তির বিধান রাখতে হবে। একই সঙ্গে জনগণের জানমালের নিরাপত্তার স্বার্থে প্রণীত আইনের কঠোর প্রয়োগ করতে হবে বলে মনে করেন এই ব্যবসায়ী নেতা। এদিকে পরিবহন শ্রমিকদের কর্মবিরতিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই। এ কর্মবিরতির ফলে মানুষের জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে এফবিসিসিআই মনে করছে। গতকাল এফবিসিসিআইর এক বিবৃতিতে বলা হয়, কর্মবিরতির ফলে দেশের পণ্য পরিবহন করা যাচ্ছে না। এতে কোথাও কোথাও পণ্যজট হচ্ছে, আবার পরিবহন বিঘ্নের কারণে পচনশীল পণ্যগুলো পচে যাচ্ছে। বিশেষ করে শাকসবজি ও ফলমূল পরিবহনে সংকটের কারণে কৃষক মারাত্মকভাবে আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। যানবাহন না থাকায় কাঁচামাল পরিবহন বিঘ্নিত হওয়ায় শিল্প-কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এ ছাড়াও রপ্তানি পণ্যসামগ্রী জাহাজীকরণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং রপ্তানিকারকগণ কার্গো বিমানের মাধ্যমে পণ্য পাঠাতে বাধ্য হচ্ছেন। ফলে বৈদেশিক মুদ্রার অপচয় হচ্ছে এবং রপ্তানিকারকগণ ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন বলে এফবিসিসিআই গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছে।  সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ড. মমতাজ উদ্দিন আহমেদ মেহেদী বলেছেন, ধর্মঘটের নামে পরিবহন খাতে শ্রমিকদের সাম্প্রতিক নৈরাজ্যে আমরা হতবাক। তারা দেশজুড়ে একটি ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। তাই আমি মনে করি, পরিবহন খাতে এ ধরনের নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির অবসানের জন্য সরকারকে এ বিষয়ে একটি আইন প্রণয়ন করতে হবে। তিনি বলেন, নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির মাধ্যমে পরিবহন শ্রমিকরা মূলত জনগণের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। এ ধরনের পরিস্থিতি মোটেও কাম্য ছিল না। সরকারকে এর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে হবে। গতকাল বাংলাদেশ প্রতিদিনকে টেলিফোনে তিনি এ কথা বলেন। সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সম্পাদক মেহেদী বলেন, পরিবহন খাতে শ্রমিকরা কিছু দাবি উত্থাপন করেছে। তারা একটি আইনের কিছু ধারার ওপরে আপত্তি জানিয়েছে। তাদের কিছু দাবি যৌক্তিক হতে পারে, আবার কিছু দাবি অযৌক্তিকও হতে পারে। সেটি নিয়ে আলাপ-আলোচনা হতে পারে। কিন্তু দাবি বাস্তবায়নে হরতাল বা ধর্মঘটের নামে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করা, জনগণকে জিম্মি করে সরকারকে দাবি বাস্তবায়নে বাধ্য করা কাম্য নয়। অথচ এই কাজটিই করছে পরিবহন শ্রমিকরা। দেশজুড়ে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির মাধ্যমে সরকারের মেয়াদের শেষ পর্যায়ে জনগণকে সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ করে তোলার অংশ হিসেবে তারা এটি করছে।

নারায়ণগঞ্জে প্রতিবাদ সমাবেশ : এদিকে নারায়াণগঞ্জে সরকারি মহিলা কলেজের শিক্ষার্থীদের গায়ে শ্রমিকদের কালি দেওয়ার প্রতিবাদে বিক্ষোভ ও মানববন্ধন করেছে তিনটি কলেজের শিক্ষার্থীরা। গতকাল দুপুরে শহরের চাষাঢ়া শহীদ মিনারের সামনে এ বিক্ষোভ মিছিল হয়। এতে অংশ নিয়ে প্রতিবাদ জানায় সরকারি তোলারাম কলেজ, নারায়াণগঞ্জ কলেজ ও সরকারি মহিলা কলেজের শিক্ষার্থীরা। বিক্ষোভ থেকে দ্রুত দোষী শ্রমিকদের আটক ও তাদের শাস্তির দাবি জানানো হয়। রবিবার শ্রমিক কর্মবিরতির প্রথম দিন নারায়ণগঞ্জে ছাত্রীদের বাসে ভাঙচুর চালিয়ে চালক ও ছাত্রীদের গায়ে কালি দেওয়ার ঘটনার পর দেশব্যাপী নিন্দার ঝড় ওঠে। শিক্ষার্থী ছাড়াও এ দিন দেশের বিভিন্ন স্থানে চালকদের গায়ে পোড়া মবিল লেপ্টে দেয় বেপরোয়া পরিবহন শ্রমিকরা। মানববন্ধনে সরকারি তোলারাম কলেজের শিক্ষার্থী শাহরিয়ার আহমেদ বলেন, পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা কর্মবিরতির নামে সারা দেশে যে নৈরাজ্য শুরু করেছে আমরা এর জবাব চাই। কেন আমাদের বোনের ড্রেসে কালি ছুড়ে মারা হবে। কেন বাসের জানালা ভাঙচুর করা হবে। সাত দিনের শিশুবাহী অ্যাম্বুলেন্স আটকে দেওয়ার ফলে শিশুটির মৃত্যুর দায় কে নেবে আমরা সেটা জানতে চাই। তিনি আরও বলেন, প্রশাসনের দায়িত্ব মানুষকে নিরাপত্তা দেওয়া। কিন্তু সাত দিনের শিশু মারা যায়, আমার বোনের ওপর পোড়া মবিল ছুড়ে মারে, বাসের যাত্রীদের হেনস্তা করে— তাহলে পুলিশ কী নিরাপত্তা দিচ্ছে। তারা কি মানুষ মারার লাইসেন্স চাচ্ছে? আমরা তাদের এ লাইসেন্স দেব না। অবিলম্বে তাদের গ্রেফতার করে আইনের আওতায় এনে শাস্তি দেওয়া হোক। প্রয়োজনে নতুন করে নৈরাজ্যবিরোধী আইন করা হোক।

শব্দপাতা ডট কম/তুষার অপু

নিউজটি শেয়ার করুন :

আপনার মন্তব্য লিখুন............