আমাদের সাহিত্যের হালচাল

আমাদের সাহিত্যের হালচাল

কামাল সিদ্দিকী : • সাহিত্য কি?
উইকিপিডিয়ার মতে, ইন্দ্রিয় দ্বারা জাগতিক বা মহাজাগতিক চিন্তা- চেতনা অনুভূতি সৌন্দর্য ও শিল্পের লিখিত বা লেখকের বাস্তব জীবনের অনুভূতি হচ্ছে সাহিত্য।
Literature can also mean imaginative of creative writing which is looked at for artistic value.
সুতরাং আমরা বলতে পারি যে, কোন লেখকের জীবনানুভূতি কল্পনার রসে ভাষা চিত্রের মাধ্যমে পাঠকচিত্তকে কিছু সময়ের জন্য দোলায়িত করার প্রক্রিয়ায় হলো সাহিত্য।

• অভিব্যক্তি প্রকাশের মাধ্যম ঃ
অভিব্যক্তিকে প্রকাশ করার জন্য যতগুলো মাধ্যম আছে তার একটি হচ্ছে ভাষা বা language অপরটি হলো ইশারা ঈঙ্গিত বা gesture (body language)। ভাষার চরম উৎকর্ষতার নাম হচ্ছে গল্প, উপন্যাস,ছড়া- কবিতা ও প্রবন্ধ। অভিব্যক্তি প্রকাশের জন্যই এগুলোর সৃষ্টি। মূলত অভিব্যক্তি প্রকাশ ছাড়া গল্প-কবিতা-উপন্যাস-প্রবন্ধ আর কিছুই নয়। অর্থাৎ যিনি যত সুন্দর করে ভাষাকে উপস্থাপন করতে পারবেন তিনি তত বেশি দৃষ্টি নন্দন হবেন, আকর্ষ্মিত হবেন ও সর্বোপরি পরিচিতি লাভ করবেন। তাই বলা যায় যে, অভিব্যক্তি প্রকাশর নামই হচ্ছে ভাষা । সেই ভাষার প্রকাশ যখন লিখিত আকারে হয় তখন তা সাহিত্য হয়ে ওঠে। আর যখন সে লেখায় শৈল্পিক আচড় পড়ে পাঠককে বিমোহিত করে তোলে তখন তা উত্তম সাহিত্যে পরিণত হয়।

• সাহিত্য পরিধি ঃ
সীমার গণ্ডিতে কখনো সাহিত্য কে বেধে দেওয়া যায় না। কারণ জীবনের ব্যাপক ও বিস্তৃত ঘটনা প্রবাহ এবং জীবন শাখার প্রতিটি দিক-মহাদিকই হলো সাহিত্যের পরিধি। তবে তা সময় ও প্রয়োজনের তাকিদে কখনো বৃহত্তর পরিসরে কখনো ক্ষুদ্রতর পরিসরে রচিত হয়। সময়ের প্রয়োজনে রচিত হতো একসময় মহাকাব্য এখন তা হয় না। এমনকি বৃহত্তর পরিসরের উপন্যাস পড়ার মত ধৈর্য ও সময় ডিজিটাল যুগের ব্যস্ত পাঠকের নেই। ছোট গল্পের সিমিত আয়োজনের সাহিত্যের গণ্ডিতে আটকা পড়তেও যেন তার মন সায় দেয় না। কারণ, সারাদিনের কর্ম ব্যস্ততার ফাঁকের সময়টুকু কেড়ে নিচ্ছে প্রযুক্তি নির্ভর ফেসবুক- টুইটার, ইউটিউব। দিনে দিনে দেখা যাচ্ছে ফেস বুক সাহিত্যের জনপ্রিয়তা আচ্ছন্ন হয়ে পড়ছেন লেখক পাঠক উভয়ে। অনেকে হয়ত বলবেন, মহাকাব্যের উপজিব্য বিষয়ের অভাবজনিত কারণে মহাকাব্য রচিত হচ্ছে না। আসলে তা ঠিক না। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের নির্মম হৃদয় বিদারক পৈশাচিক গণহত্যা বা বঙ্গ বন্ধুর সপরিবারে নিহত হওয়ার ঘটনা প্রবাহ নিয়ে কী মহা কাব্য রচিত হতে পারত না? অবশ্যই পারত। কিন্তু আধুনিক কালের ব্যস্ত পাঠক তা কতটুকু গ্রহণ করতেন তাই বিবেচ্য বিষয়। এ প্রসঙ্গে বলা যেতে পারে এক সময় পূঁথি সাহিত্য বা গ্রাম বাংলর চারণ কবিদের লিখিত কাহিনী কবিতা ও গীতি কবিতা এখন যাদুঘরের বিষয়। কারণ, প্রযুক্তি আর সময় আমাদেরকে কাগজে সাহিত্যের ভার মুক্ত করে দিচ্ছে।

• সাহিত্যের আলোচ্য বিষয় ঃ
আজ থেকে শত শত বছর আগে অভিব্যক্তি প্রকাশের মাধ্যম ছিল ইশারা-ঈঙ্গিত। তারপর মানুষ যখন কন্ঠ ধ্বণি ব্যবহার করে অভিব্যক্তি প্রকাশ করতে থাকলো এবং সভ্যতার ছোঁয়া পেতে থাকল আর সময়ের প্রয়োজনে সাহিত্যের সৃষ্টি হলো সেই সাহিত্যের বিষয় বস্তুতে স্থান পেয়েছিল তৎকালীন দেব-দেবী বা অসুর-মহাসুরের কল্পকাহিনী। যখন পৃথিবীর মানুষের প্রয়োজনের তাগাদা দেখা দিল ও অভিব্যাক্তির চরম বহিঃপ্রকাশ দেখা দিল তখন সাহিত্যের মূল ধারা হয়ে উঠল মানুষ। এখন জীবন জীবীকার তাকিদে শুধু মানুষের আলোচনা ছাড়া সাহিত্যে আর কিছুই নেই। এখন তাই সাহিত্যের মূল আলোচনাই হচ্ছে মানুষ। এই মানুষের সুখ-দুঃখ, বেদনাবোধ যার কলমে যতবেশি শৈল্পিকভাবে ফুটে ওঠে তিনি তত শক্তিশালী লেখক হিসেবে পরিচিতি লাভ করে থাকেন।

• বাংলা সাহিত্যের শক্তিমাণ লেখক ঃ
আমাদের বাংলা সাহিত্যে বঙ্কিম চন্দ্র চট্রপাধ্যায়, ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর, মাইকেল মধু সুদ দত্ত, কাজেম আলি কোরেশী কায়কোবাদ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, কবি জসিম উদ্দিন, কবি ইসমাইল হোসনে সিরাজী, মীর মোশাররফ হোসেন, শরৎ চন্দ্র চট্টপাধ্যায়, কবি আহসান হাবিব, তারা সঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় জনপ্রিয় কথা সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ কবি শামসুর রাহমান, কবি আল-মাহমুদ, বেগম সুফিয়া কামাল, শওকত ওসমান, রাবেয়া খাতুন, সেলিনা হোসেন, এমদাদুল হক মিলন, হাসান হাফিজুর রহমান, আসাদ বিন আফিজ প্রমূখ শক্তিমান সাহিত্যিক হিসেবে স্বীকৃত।

• সাহিত্যের পালাবদলে রাজনীতি ও ধর্মের ভূমিকা ঃ
সাহিত্য যেহেতু মানুষের জীবনঘনিষ্ঠ। আর তাই মানুষের জীবনের নানা ঘাত-প্রতিঘাতই হচ্ছে সাহিত্যের বিষয় বস্তু। তা হতে পারে রাজনৈতিক, সামজিক, পারিবারিক ও ধর্মীয় আবহে। আমাদের দেশে সাহিত্যের পালাবদলে মূখ্য ভূূমিকা রেখেছে রাজনৈতিক ও ধর্মীয় প্রেক্ষাপট। নানা রাজনৈতিক ভাঙ্গাগড়ার মধ্যে বার বার আমাদের সাহিত্যের বাক ফিরেছে। ধর্মীয় বিভাজন সেখানে অনুঘটকের কাজ করেছে। আধুনিক বাংলা সাহিত্যের দু’টি ধারা হিন্দু ও মুসলিম সাহিত্য মূলত ধর্মকে পুঁজি করে এগিয়ে চলেছে। সেই অষ্টাদশ শতাব্দী থেকে অদ্যাবধী। তারপর দ্বিজাতি তত্তের ভিত্তিতে ভারত পাকিস্তান বিভক্তির কারণে কলকাতার সাহিত্য আর ঢাকার সাহিত্য পটভূমি রচিত হয়। ধর্ম আর রাজনীতি আমাদের লেখকদের বিভক্ত করে তোলে। সাথে সাথে একই বাংলা ভাষায় দু’টি শৈল্পিক আচরন বা ঢঙ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কলকাতার লেখকদের ভাষা প্রয়োগ আর ঢাকা বা বাংলাদেশের লেখকদের ভাষা ব্যবহার বিধি লক্ষ্য করলেই তা বোঝা যায়। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর পাকিস্তানী শাসক শ্রেণির সাম্প্রদায়িক মনোবৃত্তির কারণে প্রথম আঘাতটি আসে আমাদের ভাষার উপরে। পাকিস্তানী শাসক শ্রেণি বাংলাভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে অস্বীকার করায় সমগ্রবাঙ্গালী জাতি প্রতিবাদের ঝড় তোলে। ১৯৫২ সালে এক রক্তক্ষয়ী বিপ্লবের মাধ্যমে বাঙ্গালী তার মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষা করে। বায়ান্ন সালকে চেতনার উৎস ধরে বাংলা সাহিত্যের পালাবদল শুরু। ছড়া- কবিতা, গল্প-গান সর্বত্র বায়ান্নর ভাষা আন্দোল স্থান করে নেয়। তাৎক্ষণিকভাবে আব্দুল গফ্ফার চৌধুরী রচনা করেন ‘আমার ভায়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারী আমি কি ভুলিতে পারি।” যা এখন প্রভাত ফেরিতে শোকের মুর্চ্ছনা হিসেবে হাজার কন্ঠে ধ্বণিত হয়। এভাবে এক একটি আন্দোলনে যোগ হতে থাকে বাংলা সাহিত্যের পটভূমি। এদেশের দামাল ছেলেদের বিরত্বের গাঁথা সাহিত্যের বিষয় বস্তু হয়ে দাঁড়ায়। অগ্রজ কবি সাহিত্যিকরা এব্যাপারে পথিকৃতের ভূমিকা রাখেন। কবি শামসুর রাহমানের আসাদের সার্ট, বা ১৯৭১ সালে রচিত ‘স্বাধীনতা আমার’ কবিতার মত অনবদ্য কবিতা রচিত হতে থাকে। একথা বললে অত্যুক্তি হবে না যে , এমন নবীন প্রবিণ কবি সহিত্যিক পাওয়া যাবে না যারা ভাষা আন্দোলন তথা আমাদের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কোন না কোন লেখা লেখেন নি। বড় কথা হচ্ছে এসকল সংগ্রামে এদেশের লেখক সাহিত্যিকদের ক্ষুরধার লেখনি এদেশের মানুষকে জাগ্রত করতে মূখ্য ভূমিকা রেখেছে। বিশেষ করে কবি কাজী নজরুল ইসলামের আগুন ঝরা কবিতা ও রণ সঙ্গীত বাংলার দামাল ছেলেদের জীবনবাজিতে উদ্দীপনা জাগিয়েছে।

• আমাদের সাহিত্যে স্বাধীনতার ফল ঃ
আমাদের জাতীয় জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন হলো মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে একটি স্বাধীণ সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রাপ্তি। যা আমাদের সামগ্রিক চিন্তা চেতনায় অনন্য স্বকীয়তা সৃষ্টি করেছে। আমাদের ভাষা সাহিত্যেরও মুক্তি এনে দিয়েছে। মুক্তবুদ্ধি চর্চার দ্বার খূুলে দিয়েছে। বাঙ্গালা একাডেমির মাধ্যমে প্রতিনিয়ত চলছে বাংলাভাষার উপর নানান গবেষণা। পাঠকদের চাহিদার প্র্রয়োজনে প্রকাশিত হচ্ছে বিশ্বকোষ ও নানান ভাষার অভিধানসহ বিভিন্ন গবেষণামূলক বই। বাঙ্গালী মুসলিম সাহিত্যের যে দৈন্যতা ছিল তারও অবসান হয়েছে। ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে অজস্র ধর্মীয় পুস্তকাদি প্রকাশিত হচ্ছে। মানুষের জ্ঞান বিকাশে যা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। প্রতিবছর একুশে বই মেলাকে কেন্দ্র করে অসংখ্য সৃজনশীল বই প্রকাশিত হচ্ছে। প্রতিনিয়ত যেখানে যুক্ত হচ্ছে নবীন লেখকবৃন্দ। দিন দিন পাঠক সংখ্যাও বাড়ছে। বিশেষ করে সেখানে তরুণ-তরুণীদের অংশগ্রহণ লক্ষ্যণীয়। একুশে বই মেলার কারণে একটি নতুন পাঠক শ্রেণীও তৈরী হয়েছে। যাদের অধিকাংশই হচ্ছে তরুণ সমাজ। যারা দিন দিন সৃজনশীল কর্মকা-ের সঙ্গে জড়িত হচ্ছে। এগুলো আমাদের স্বাধীনতার ফল।

• পত্র-পত্রিকা ও সাহিত্যআসর ঃ
বাংলাদেশের পত্র-পত্রিকার সাহিত্য পাতাগুলোতে প্রতিনিয়ত প্রকাশিত হচ্ছে অসংখ্য ছড়া -কবিতা, ছোট গল্প, উপন্যাস ও নানা বিষয়ের উপর লিখিত প্রবন্ধ। বিভিন্ন সাহিত্য সংগঠনগুলো থেকে প্রকাশিত হচ্ছে লিটল ম্যাগ, যেখান থেকে বেরিয়ে আসছে প্রতিশ্রুতিশীল লেখক সাহিত্যিক। দেশের প্রায় সর্বত্র কমবেশী সাহিত্য আসর বসছে। জাতীয় বা স্থানীয় পর্যায়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে সাহিত্য বিষয়ক সম্মেলন।

সত্যকথা বলতে কি সাহিত্য আসর গুলো হচ্ছে লেখক তৈরীর কারখানা। যেখানে প্রতিষ্ঠিত লেখকদের সুচারু যত্নে একজন নবীন ও দূর্বল লেখক শক্তিশালী লেখকে পরিণত হন। বাস্তবতা হচ্ছে একা একা চর্চা করে ভালো কবি সাহিত্যিক হওয়া যায় না। যার জন্য চাই নিরব সাধণা ও একজন মালির পরিচর্যা। যা একটি সাহিত্য আসরে পাওয়া যায়।

• সাহিত্য আড্ডা; না সাহিত্য আসর?
সাহিত্য আসরকে অনেকে সাহিত্য আড্ডা হিসেবে অভিহিত করে থাকেন। আসলে আড্ডা শব্দটিকে আমার কাছে খুবই বেমানান বলে মনে হয়। যেখান থেকে তেমন কিছু অর্জিত হয় না। সমাজের ফালতু মানুুুষেরা আড্ডা দিয়ে সময় নষ্ট করে থাকে। সেই আড্ডাতে কিভাবে জ্ঞানী গুণী মানুষের অংশ গ্রহণ থাকে উপলব্ধিতে আসে না। কারণ আড্ডা হলো নিছক পরিহাসস্থল। যে আলোচনার কোন লাগাম থাকেন, বিষয় বস্তু থাকে না এমনকি শৃঙ্খলা বা সময় সচেতনতা থাকে না সেটিই মূলত আড্ডা। কিন্তু সাহিত্য আসরগুলো কী আসলেই তাই ?

কেননা Oxford Dictionary on line version এ আড্ডা শব্দের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে:

1. A place where people gather for conversation.

1.1. an illicit drinking place ~ The young men spent their time at the street corner addas at tea stall.

1.2. [mass noun] informal conversation among a group of people.
Synonyms : discussion, talk, chat, gossip.
origin: From Hindi adda.
Urban Dictionary : Adda means all day drinking affair is when a group of friends start drinking early in the morning and continue to drink all day and late into night or early the next morning.

বাংলা একাডেমির অভিধান এ আড্ডা শব্দের অর্থ :
Bengali English Dictionary ~ company of idle talkers or, Keep company of idle talkers.
সর্বোপরি সংসদ বাংলা অভিধানে ‘আড্ডা’ শব্দের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে যে, শব্দটি প্রধানত নিন্দা অর্থে ব্যবহৃত হয়। (চোরের আড্ডা, গুলির আড্ডা) বা বৃথা গল্পগুজুবে কালক্ষেপ করা, আড্ডায় আলস্যে সময় কাটায় এমন। যদিও তার স্বাভাবিক অর্থ গ্রহণ করা হয়েছে- বাসস্থল, মিলন স্থল ইত্যাদি।
বাংলা সংসদ অভিধানে
আসর শব্দের অর্থ সভা, মজলিস ইত্যাদি। যার কোন কদর্থ পরিলক্ষিত হয়নি।

বাংলা একাডেমি র অভিধান এ আসর শব্দের অর্থ :
Bengli English Dictionary ~ A gathering/sitting/party

: put a gathering into good humor. or, make oneself the center of interest an assembly by artfulness or gift of the gab.
পাঠকদের সুবিধার্থে আড্ডা ও আসর শব্দের অর্থ তুলে ধরা হলো এ কারণে যে, একজন লেখক কখনো অহেতুক মজলিসে বসে অলস সময় কাটাতে পারেন না। তিনি যখনি যে পরিবেশে থাকেন সেখান থেকে তার লেখার পাথেয় সংগ্রহ করেন। জাতিকে আলোকিত করেন। তিনি কোন ফালতু মানুষ নন যে আলস্যে সময় কাটাবেন।

• লেখকের লেখার উদ্দেশ্য ঃ
আসলে একজন লেখক বা সাহিত্যক তিনি কেন লেখেন? এ প্রশ্নের উত্তর প্রায় সকল লেখকের একই । আর তা হ’লো একান্ত মনের আনন্দে লিখি। ব্যাপারটি আসলেই কি তাই? হয়ত তা নয়। প্রথম দিকে লেখক হয়তো নিজের মনের আনন্দের জন্যই লেখেন। বা সত্য ও সুন্দরের বহিঃপ্রকাশের জন্য লেখেন। সর্বোপরি আত্মপ্রকাশের শ্লাঘা (Laudation) হতে লেখেন । কিন্তু সেটা সাময়িক। কারণ এক সময় তাকে সামাজিক দায়বদ্ধতার কারণে লিখতে হয়। এ প্রসঙ্গে কবি কাজি নজরুল ইসলাম তাঁর ‘বাঙলা সাহিত্যে মুসলমান’ নামক প্রবন্ধে লিখেছেন, ‘সাহিত্য হচ্ছে বিশ্বের, ইহা একজনের হতে পারে না। সাহিত্যিক নিজের কথা, নিজের ব্যথা দিয়া বিশ্বের কথা বলিবেন, বিশ্বের ব্যথায় ছোঁয়াও দিবেন। সাহিত্যিক যতই সূক্ষ্মতত্ত্বের আলোচনা করুন না, তাহা দেখিয়াই যেন বিশ্বের যে কোন লোক বলিতে পারে, ইহা তাঁহারই অন্তরের অন্তরতম কথা”।

• সাহিত্য বা শিল্পকর্ম মূলত পাঠক বা দর্শকের সম্পদ ঃ
সাহিত্যিকের রচিত যে কোন লেখা একান্ত তার নিজের সম্পত্তি নয়। যে তিনি যা ইচ্ছা তাই লিখবেন বা যা ইচ্ছা তাই লেখার অধিকার রাখেন। যে কোন শিল্পকর্ম প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে তা দর্শক-শ্রোতা বা পাঠকের হয়ে যায় এবং তা জাতীয় সম্পদে পরিণত হয়। সেই শিল্পের গুণাগুণ বিচারের অধিকার একমাত্র বিদগ্ধ শিল্পবোদ্ধার বা পাঠকের। তাদের বিচারে তা নন্দিত বা নিন্দিত হতে পারে। এখানে লেখক বা সাহিত্যেকের রাগ-গোস্বার কিছুই থাকতে পারে না। আর তাই লেখকের লেখা হতে হবে শিল্পমানোত্তীর্ণ । আর তখনই তিনি একজন কালজয়ী লেখকে পরিণত হবেন।

• সাহিত্যিকের দায়ভার ঃ
কিন্তু আমাদের বর্তমান সাহিত্যের মানদণ্ডে লেখার দিক থেকে নয়; লেখকের মনের দিক থেকে অসুন্দরের কুলক্ষণী ছায়া দেখা যাচ্ছে। তাই হয়তো কবি কাজি নজরুল ইসলাম বলেছেন, ‘আমাদের সাহিত্য সৃষ্টি আবার তেমনি সঙ্কীর্ণ, ভণ্ডামী, অসত্য রোগের বিজানু প্রভৃতিতে ভরা। লেখকের লেখা হইতেছে তাঁহার প্রাণের সত্য অভিব্যক্তি। যেখানে লেখক সত্য তাঁহার লেখাতেও সে সত্য অভিব্যক্তি ফুটিয়া উঠিবে ; যেখানে লেখক মিথ্যা, সেখানে সেই মিথ্যকে হাজার চেষ্টা করিলেও তিনি লুকাইতে পারিবেন না। সাধারনের চক্ষে যদি না পড়ে তবে জহুরির চক্ষে তাহা পড়িবেই পড়িবেই।’ (বাঙলা সাহিত্যে মুসলমান)

সুতারং লেখকে অবশ্যই সতর্কতার সঙ্গে এগিয়ে যেতে হয়। তার লেখার মাধ্যমে যাতে কোন ভুল ম্যাসেজ পরিবেশিত না হয় সে দিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। কারণ ,হয়ত হতে পারে একজন নবীন পাঠক আপনার সাহিত্য কর্ম দিয়ে তার পাঠাভ্যাস শুরু করতে যাচ্ছে। সে আপনাকে আইকন ভেবে আপনার মনোদর্শনে বিচরণ করতে চাচ্ছে। এমতাবস্থায় সে যদি চলার শুরুতে আপনার দ্বারা হোঁচট খায় তবে এর দায়ভার লেখককেই বহন করতে হবে। এবং তার মনোজগতে যে কালোমেঘের আচড় পড়বে তার কু প্রভাব সমাজেও বিস্তার করার আশঙ্কা থেকে যায়। কারণ, পৃথিবীতে সাহিত্য কর্মের চেয়ে সূদূর প্রসারী প্রভাব বিস্তারকারী দ্বিতীয়টি আর নেই।

সাহিত্য প্রেরণাই হলো সভ্যতা ঃ
এ সাহিত্যকর্মই পৃথিবীকে নানা রঙে নানা বর্নে সাজিয়েছে। বিপ্লব ,রেনেসাঁর মূলে এ সাহিত্যকর্মেরই ফল। রাজনীতি ও অর্থনীতির সলিল ধারাও সাহিত্যকর্ম এর প্রেরণা। ধর্মের অমীয় বাণীর আবেদনও সাহিত্যকর্মের অনুরণন ছাড়া কিছুই নয়। কোরাআন, বাইবেল, গীতা-রামায়ণ, মহাভারত, ত্রিপিটক তারই স্বাক্ষর বহন করে। কবি আল্লামা ইকবাল বলেছেন, I am not a poet of today. I am the Voice of tomorrow. বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, ‘তুমি যতই বড় হও মৃত্যুর চেয়ে বড় নও ; আমি মৃত্যুর চেয়ে বড়।’ পৃথিবীর সব কর্ম থেমে গেলেও সাহিত্যকর্ম জাগরণ কখনো থামবে না। ধ্বংসস্তুপের মধ্যে থেকে যে শিখার দাহন আবার সকলকে জাগ্রত করতে পারে তার নামই হলো সাহিত্যকর্ম।

• শ্লীল-অশ্লীল সাহিত্য ঃ
আসলে শ্লীল-অশ্লীল সাহিত্যের কথা তখনই এসে যায় যখন লেখকের দায়বদ্ধতার প্রশ্ন আসে। কারণ, একজন লেখক সত্য ও সুন্দরের পুজারি। সকল পজেটিভ দিকগুলো তিনি তার কলমে তুলে ধরে সমাজ বির্নিমাণে ভূমিকা রাখেন। সাথে সাথে সমাজ-সভ্যতার বিপক্ষে নেতীবাচক দিকগুলো চিহ্নিত করে সত্যের মশাল প্রজ্জ্বলন করে থাকেন। এক কথায় জাতিকে আগামীর স্বপ্ন দেখান। অসুন্দরের স্থান সাহিত্যে নেই বল্লেই চলে। মানব জীবনের নানা ঘাত-প্রতিঘাত, উত্থান-পতন, হাসি-কান্না, সুখ-দুঃখ , বিরহ-যাতনা, প্রেম-ভালোবাসার ভাষাচিত্রের নামই হলো সাহিত্য। আর তা সাহিত্যের যে মাধ্যমে হোকনা কেন। এ প্রসঙ্গে কবি রবীন্দ্রনাথের বিখ্যাত কবিতা

বর্ষাযাপনে বলা হয়েছে –
ছোট প্রাণ, ছোট ব্যথা, ছোট ছোট দুঃখকথা
নিতান্তই সহজ সরল
সহস্র বিস্মৃতি রাশি প্রত্যহ যেতেছে ভাসি,
তারি দু’চারিটি অশ্রুজল।
নাহি বর্ণনার ছটা ঘটনার ঘনঘটা,
নাহি তত্ত্ব, নাহি উপদেশ-
অন্তরে অতৃপ্তি রবে, সাঙ্গ করি মনে হবে
শেষ হয়ে হইল না শেষ।
জগতের শত শত অসমাপ্ত কথা যত,
অকালের বিচ্ছিন্ন মুকুল,
অজ্ঞাত জীবনগুলা, অখ্যাত কীর্তির ধুলা,
কতভাব কত ভয় ভুল, –
সংসারের দশ দিশি ঝরিতেছে অহর্নিশি
ঝরঝর বর্ষার মতো-
ক্ষণ অশ্রু ক্ষণ হাসি পড়িতেছে রাশি রাশি,
শব্দ তার শুনি অবিরত।
সেইসব হেলাফেলা, নিমেষের লীলাখেলা
চারি দিকে করি স্তুপাকার
তাই দিয়ে করি সৃষ্টি একটি বিস্মৃতি বৃষ্টি
জীবনের শ্রাবণনিশার।

কবি গুরুর এ কবিতায় মানব জীবনের খুঁটি নাটি সব কিছুকেই সাহিত্যের বিষয় হিসেবে দিক নির্দেশনা করেছেন। সুতারং জীবনের সকল অনুসঙ্গ সাহিত্যে আসতে পারে জীবন শিল্পের প্রয়োজনে। নান্দনিকতার আদলে। কিন্তু সেখানে অশ্লীল সাহিত্যের কোন স্থান নেই; যেমন সাহিত্যে অনাচার -অত্যাচার তথা নোংরামির স্থান নেই। সুস্থ সংস্কৃতি বিকাশের অপর নাম সাহিত্য। আমাদের মূল্যবোধ যার মাপকাঠি । আমাদের পূর্বসূরিরা যে সাহিত্যের বীজ বপন করে গিয়েছেন সেখানে কোন অশ্লীলতার স্থান নেই। সাহিত্যের প্রয়োজনে নারী এসেছে বার বার । কখনো গৃহলক্ষ্মী হিসেবে, আবার কখনো প্রেমের অভিব্যক্তির মাধুরি ছড়াতে। রূপ-রস-গন্ধ সেখানে আপন মহিমায় ভাস্বর। কিন্তু নোংরামী বা স্বীকৃত মূল্যবোধকে মাড়িয়ে যে সাহিত্য তা আমাদের সমাজে দ্যূতি ছড়াতে পারে নি।

বাঙ্গালী মধ্যবিত্ত পরিবারে যেসকল সাহিত্যিকগণ সমাদরে নন্দিত তাদের কেউই অশ্লীল সাহিত্যের ধারক-বাহক নন। আমার দৃষ্টিতে বাংলা সাহিত্যে রবীন্দ্র নাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, শরৎ চন্দ্র কবি জসিম উদ্দিন , হালের কথা সাহিত্যিক হুমায়ুণ আহমেদ এর চেয়ে জনপ্রিয় লেখক খুবই কম আছেন। তার মধ্যে বর্তমানে হুমায়ুন আহমেদের সাহিত্য জনপ্রিয়তা ঈর্ষণীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে। আর এটা সম্ভবপর হয়েছে শুধু সাহিত্যে তার বিচিত্র চরিত্র চিত্রনের জন্য। মধ্যবিত্ত পরিবারের ইমেজকে তার সাহিত্যে লালন করে তিনি সকলের মন আকৃষ্ট করেছেন; কোন নোংরামি দিয়ে নয়। আর সেখানে সবচেয়ে অগ্রাধীকার পেয়েছে বাঙ্গালী মুসলমান চরিত্র। ইসলামি কালচার আর বাঙ্গালী স্বকীয়তাবোধ মুক্তিযুদ্ধের চেতনার আবহে তিনি যে সাহিত্যের ক্ষেত্র রচনা করেছেন যা তাকে জনপ্রিয়তার শীর্ষে নিয়ে গিয়েছে। সেখানে অশ্লীলতা ছিল না।

মনে রাখা দরকার সাহিত্য বলি আর সংস্কৃতি বলি। নিজের সমাজ-ধর্ম, ইতিহাস- ঐতিহ্য ও মূল্যবোধের বাইরে গিয়ে যে শিল্প সাহিত্য রচিত হয় তা বৃহত্তর সমাজ গোষ্ঠির দ্বারা গৃহীত হয় না। অতীতে যারাই তা করতে গিয়েছেন তারা পরিত্যায্য হয়েছেন। তা কোন প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠি কর্তৃক নয়; সময়ের প্রয়োজনে। অনেকে হয়ত নিজের গ্রহণ যোগ্যতা বৃদ্ধির জন্য তরুণ প্রজন্মের ক্রেজকে পুঁজি করে সাহিত্য রচনা করতে চান। সাময়িক সময়ের জন্য তার সফলতাও দেখা যেতে পারে কিন্তু তা চিরায়ত সাহিত্যে স্থান করে নিতে পারে না। মুক্তবুদ্ধি চর্চা অর্থ যা ইচ্ছে তা লেখা নয়; সত্য সুন্দর ও শালীনতার মধ্যে কলমের অধিকার প্রতিষ্ঠার নামই হলো মুক্তবুদ্ধি র্চ্চা। সেখানে ধর্ম কোন বাধা নয়; ধর্ম আমাদের মূল্যবোধের অংশ ও সাহিত্য সহায়ক। সাহিত্য হলো জীবনের নানা ব্যঞ্জনা। ধর্ম তার অনুষঙ্গ। অর্থাৎ মানবীয় আচরণের বিশাল ক্যাম্পাসই হলো সাহিত্য। যেখানে অশ্লীলতা বা পর্ণোগ্রাফির কোন অবকাশ নেই।

লেখক : কামাল সিদ্দিকী (কবি ও কলামিস্ট)।

আপনার মন্তব্য লিখুন............