একটি ইতিহাসের পরম্পরা…

0
94
একটি ইতিহাসের পরম্পরা...

কাজী আনিসুল হক : কাজী নজরুল ইসলাম। বাংলাদেশের জাতীয় কবি। তার আরো একটি নাম দুখু মিয়া। ১৯৭১ সালে ততকালিন পশ্চিম পাকিস্থান থেকে ৯ মাস যুদ্ধের বিনিময়ে অর্জিত হয় আজকের স্বাধীনতা। জাতি পিতা শেখ মুজিবর রহমান এই স্বাধীন সার্বভোম বাংলাদেশের অগ্রনায়ক। ‘জয় বাংলা’ বাঙালির মুক্তির মন্ত্র। একাত্তরে দেশ স্বাধীন হলেও স্বাধীনতার ৪১ বছর আগে এই রূপকল্প এঁকেছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম। ১৯২৯ সালে “বাংলাদেশ” শিরোনামে কবিতায় তিনি লিখেছেন-‘নমঃ নমঃ নমঃ বাংলাদেশ মম/চির-মনোরম চির-মধুর’। যে কবিতায় রয়েছে ষড় ঋতু এবং বাংলা সংস্কৃতির বর্ণনা ও স্বাধীন বাংলাদেশের মানচিত্র। সেই ঐতিহাসিক কবিতায় শেষ পঙক্তিতে তিনি লিখেছেন ‘ঘুমাবো এ বুকে স্বপ্নাতুর’। যা বর্তমান স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম রূপকল্প। বঙ্গবন্ধু সেই রূপকল্পের বাস্তবায়ক মাত্র। জাতি পিতা শেখ মুজিবর রহমান বাংলাকে দেখেছিলেন নজরুলের চোখে। কেননা, সেক্যুলার বাংলাদেশের প্রতীক-‘জয় বাংলা’। বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ভেতর থেকে নজরুল, চয়ন করেছিলেন: ‘বাংলা বাঙালির হোক। বাংলার জয় হোক, বাঙালির জয় হোক’- অবিনাশী পংক্তিমালা। ১৯২২ সালে নজরুল রচিত ‘ভাঙার গান’ কাব্যগ্রন্থে ‘পূর্ণ-অভিনন্দন’ কবিতায় ২৭ তম পক্তির প্রথমাংশে প্রথম উচ্চারিত হয় “জয় বাংলা”। সেখানে কবি লিখেছেন- ‘জয় বাংলা’র পূর্ণচন্দ্র, জয় জয় আদি-অন্তরীণ/ জয় যুগে-যুগে-আসা-সেনাপতি, জয় প্রাণ আদি-অন্তহীন!’

বাংলাদেশ ও বাঙালির জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামকে আমাদের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে পরিচয় করিয়ে দেন বাঙালি জাতিপিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৭২ সালের ২৫ মে স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম ‘নজরুল-জয়ন্তী’ অনুষ্ঠানে প্রদত্ত বাণীতে তিনি বলেন, “নজরুল বাঙলার বিদ্রোহী-আত্মা ও বাঙালির স্বাধীন ঐতিহাসিক-সত্তার রূপকার।”

একটি ইতিহাসের পরম্পরা...

কিন্তু অনেকেই জানেন না, আমাদের জাতীয় কবি’র মূল আবিষ্কারক একজন পুলিশ অফিসার- “দারোগা কাজী রফিজ উদ্দিন”। আসানসোলের রুটির দোকানের কর্মচারি কিশোর নজরুলকে এক প্রকার কুড়িয়ে এনে ময়মনসিংহে দরিরামপুর স্কুলে ভর্তি করেন নিজ দায়িত্বে।

বায়ন্নর (৫২) ভাষা আন্দোলনের কথা আমারা সকলেই কম-বেশি জানি, যেদিন বাংলা ভাষার জন্য প্রান দিয়ে ছিলো রফিক, জব্বার, ছালামসহ তৎকালীন বিপ্লবীরা। যার ফলে আজ সেই ঐতিহাসিক বিপ্লব আর্ন্তরজাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে বাংলাকে এনে দিয়েছে জতিসংঘ স্বিকৃতি। হাজার বছরের ইতিহাসে বাংলা ভাষা-ভাষি মানুষের জন্য কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন আধুনিক জীবন যাত্রায়, মুক্তির চেতনায়, বাক স্বাধীনতার স্বাধ অর্জনে পথেয়।

ধানমন্ডির ২৮ নম্বর সড়কের বাড়িতে আছে কবি ভবন। ১৯৭২ সালের ২৪ মে থেকে ‘৭৫-এর ২২ জুলাই পর্যন্ত কবি এ বাড়িতে ছিলেন। পরিকল্পনার অভাবে এ বাড়ি লোকচক্ষুর আড়ালে পড়ে গেছে। বাড়িটির সামনে ছিলো বাগান সেখানে কবি হাঁটতেন, ঘুরতেন।

বাঙালি জাতিকে মুক্তির আলো দেখাতে, বাঙালির মনে স্বাধীনতার বীজ বপন করতে, জাতিকে পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করতে আপসহীন রণনায়কের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯-১৯৭৬)। তিনি তাঁর ‘কান্ডারি হুঁঁশিয়ার’ কবিতায় বলেন : ‘কে আছো জোয়ান হও আগুয়ান হাঁকিছে ভবিষ্যৎ/ এ তুফান ভারি, দিতে হবে পাড়ি, নিতে হবে তরী পার।’ এই কবিতায় মুক্তির পতাকা ধারণ করতে নজরুল যে জোয়ানের আহ্বান করেন, যে দিশারির কামনা করেন, বাঙালির জীবনে সেই দিশারি হলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান (১৯২০-১৯৭৫)। বাংলার ঘুমন্ত মানুষকে জাগানোর উদ্দেশ্যে ‘বাঙালির বাঙলা’ প্রবন্ধে নজরুল আশাবাদ ব্যক্ত করেন ‘বাঙলা বাঙালির হোক। বাঙলার জয় হোক। বাঙালির জয় হোক।’ নজরুলের এই আশাবাদকে পরবর্তীকালে বাস্তবে রূপদানের ক্ষেত্রে প্রধান কান্ডারি ছিলেন বঙ্গবন্ধু। যে বাংলার স্বপ্নের রূপ নজরুল তাঁর কাব্য, সংগীত, প্রবন্ধ প্রভৃতিতে বিশেষভাবে উল্লেখ করেন, বঙ্গবন্ধু সেই স্বাধীন বাংলায় নজরুলের উপস্থিতি অত্যন্ত জরুরি মনে করেন। ১৯৭২ সালে সদ্য প্রতিষ্ঠিত দেশকে সাজাতে বঙ্গবন্ধু দেশের দায়িত্ব পাওয়ার পর যে বিষয়গুলো সবচেয়ে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেন তার মধ্যে অন্যতম প্রধান ‘নজরুল’ প্রসঙ্গ তিনি গুরুত্ব দেন। তাই স্বাধীনতার ছয় মাসের মধ্যেই বঙ্গবন্ধুর ঐকান্তিক চেষ্টায় যেমন নজরুলের ‘চল্ চল্ চল্’ গানটিকে রণসংগীতের মর্যাদা দেওয়া হয়, পাশাপাশি ১৯৭২ সালে তেমনি তাঁকেও পুনর্বাসন করা হয় এই স্বাধীন বাংলাদেশে।

বঙ্গবন্ধু বাংলার বন্ধু, বাঙালির বন্ধু। বাঙালি জাতি তাদের মস্তকে বঙ্গবন্ধু নামক তিলক ধারণ করে বঙ্গবন্ধুকে নেতা নির্বাচন করেছে। বাঙালি বঙ্গবন্ধুকে আস্থার সিংহাসনে রেখেছে বলেই তাঁর এক কথায় জাতি মৃত্যুকে তুচ্ছ মনে করে মুক্তি সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। নজরুল তার শেষ ভাষণে বলেছিলেন : ‘বিশ্বাস করো, আমি কবি হতে আসিনি।’ তবুও নজরুল হয়েছিলেন বাঙালির প্রাণের কবি। অন্যদিকে বঙ্গবন্ধুর চাওয়া ছিল- সর্বক্ষেত্রে বাঙালির জীবনে সুখ নিয়ে আসা, বিশ্বের দরবারে বাঙালিকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে দেখা। তাই তিনি নির্দ্বিধায় ৭ই মার্চের ভাষণে বলেছিলেন : ‘আমি প্রধানমন্ত্রীত্ব চাই না, মানুষের অধিকার চাই।’ বঙ্গবন্ধুও বাঙালি জাতির শ্রেষ্ঠ নেতায় পরিণত হয়েছিলেন।

নজরুলের শ্রেষ্ঠ কবিতা ‘বিদ্রোহী’। নির্দ্বিধায় বলা যায়, এমন একটি কবিতাই পারে কবিকে সুউচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত করতে। ১৯২২ সালে কবিতাটি প্রকাশ হওয়ার পরই ভারতবর্ষে সৃষ্টি হয়েছিল নজরুল দ্যোতনার। নজরুলের দ্রোহের যে শক্তিশালী প্রকাশ এই কবিতায় দেখা যায় তা সাহিত্যের পাতা থেকে শুরু করে রণাঙ্গন পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছিল। আবার রাজনীতির কবি বঙ্গবন্ধুও তাঁর শ্রেষ্ঠ কবিতা পাঠ করলেন লক্ষ-কোটি জনতার সামনে ৭ই মার্চে। মুক্তি না হওয়া পর্যন্ত যে লড়াইয়ের ডাক তিনি দিয়েছিলেন তা হলো : ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম।/ এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ আর নজরুল তার ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় বলেছিলেন : ‘যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না,/ অত্যাচারীর খড়গ কৃপাণ ভীম রণ-ভূমে রণিবে না-/ বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত/ আমি সেই দিন হব শান্ত।’

বঙ্গবন্ধু তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণের শেষাংশে বলেন ‘জয় বাংলা’। অন্যদিকে নজরুল ‘বাঙালির বাঙলা’ প্রবন্ধের শেষাংশে বলেন : ‘বাঙলার জয় হোক।’

‘১৯২৯ সালে কলকাতার আলবার্ট হলে, নজরুলের যখন ২৯ বছর বয়স, সে সময়ে তাকে নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু বলেছেন, আমি সারা ভারতবর্ষ ঘুরেছি কিন্তু দুর্গম গিরি কান্তার মরুর মতো কোনো গান আমি খুঁজে পাইনি। এবং তিনি ঘোষণা দেন, যেদিন দেশ স্বাধীন হবে, ভারতবর্ষ যেদিন স্বাধীন হবে, বাঙালীর জাতীয় কবি হবেন কাজী নজরুল ইসলাম।’

বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর প্রথম ভারত সফরেই শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীকে অনুরোধ করে নজরুলকে বাংলাদেশে নিয়ে আসেন জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমান। তাকে ঘোষণা করলেন বাংলাদেশের জাতীয় কবি হিসেবে। ১৯২৯ সালে নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুর দেখা স্বপ্নের বাস্তবায়ন হলো বিপ্লবী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাত ধরে।

তৎকালীন রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান এক বাণীতে তিনি বলেন, ‘কবি কাজী নজরুল ইসলাম বাঙলার বিদ্রোহী-আত্মা ও বাঙালির স্বাধীন-ঐতিহাসিক-সত্তার রূপকার। বাঙলার শেষ রাতের ঘনান্ধকারে নিশিত-নিশ্চিন্ত নিদ্রায় বিপ্লবের রক্ত-লীলার মধ্যে বাঙলার তরুণরা শুনেছে রুদ্র-বিধাতার অট্টহাসি, কাল-ভৈরবের ভয়াল গর্জন- নজরুলের জীবনে, কাব্যে, সংগীতে ও তাঁর কণ্ঠে। প্রচন্ড সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাসের মতো, লেলিহান অগ্নিশিখার মতো, পরাধীন জাতির তিমির-ঘন অন্ধকারে বিশ্ববিধাতা নজরুলকে এক স্বতন্ত্র ছাঁচে গড়ে পাঠিয়েছিলেন এই ধরার ধুলায়।’

কুমিল্লায় নজরুল জয়ন্তী পালন কালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর বক্তব্যে বলেন, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কবি কাজী নজরুল ইসলামকে আমাদের মাঝে নিয়ে আসেন। ১৯৭২ সলে সপরিবারে বঙ্গবন্ধুই কলকাতা থেকে কবিকে বাংলাদেশে নিয়ে আসেন এবং জাতীয় কবির স্বীকৃতি দেন। তাই আমরা কাজী নজরুল ইসলামকে জাতীয় কবি হিসেবে সম্মান দিয়ে যাচ্ছি। তিনি ছিলেন আমাদের প্রেরণার কবি, সাম্যের কবি, চেতনার কবি।

তিনি জানান, জাতির জনক ছিলেন বিপ্লবী আর জাতীয় কবি বিদ্রোহী। তিনি আমাদের এগিয়ে যাওয়ার পথ দেখিয়েছেন আর বঙ্গবন্ধু দিয়েছেন স্বাধীনতা। আমাদের জয় বাংলা স্লোগানটিও কবি নজরুলের একটি কবিতা থেকে সংগ্রহ করেছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

শুধু এই নয়, বাঙালি জাতিপিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে দুইদিন পর- ১৯৭২সালের ১০ জানুয়ারি স্বদেশে আসেন। এখানে মনে পড়ে, ১৯২২ সালের ১০ জানুয়ারি তারিখে সমগ্র পৃথিবীর অদ্বিতী প্রতিবাদী কবিতা “বিদ্রোহী” প্রকাশিত হপয়েছিল। এটি একটি ইতিহাসের পরম্পরা…

লেখক : নজরুল সৈনিক, সাংবাদিক, কবি ও সংগঠক।

নিউজটি শেয়ার করুন :

আপনার মন্তব্য লিখুন............