একাত্তরের সাক্ষী বুড়িগঙ্গা-ধলেশ্বরী

একাত্তরের সাক্ষী বুড়িগঙ্গা-ধলেশ্বরী
রণজিৎ মোদক

রণজিৎ মোদক : একদিকে শিল্প বন্দর অপরদিকে সবুজ শ্যামল প্রান্তর। মাঝখানে স্রোতস্বিনী বহুকালের স্বাক্ষী বুড়িগঙ্গা-ধলেশ্বরী। স্বচ্ছ সলিলা সঞ্জিবনী স্রোতের বুকে ১৬৬৬ খ্রিস্টাব্দে ফরাসী পরিব্রাজক ভার্নিয়ার নৌ ভ্রমণে অপরূপ দৃশ্য অবলোকন করে তার প্রশংসা করেন। আনন্দ বেদনার বহু ঘটনার ইতিবৃত্ত নিয়েই সৃষ্টি হয়েছে বহু ইতিহাস। বিধবা ব্রাহ্মণ কন্যা তার মিথ্যা চারিত্রিক অপবাদ সহ্য করতে না পেরে নদীতে ঝাপ দিয়ে আত্মহত্যা করেন। সেই থেকে নদীর নাম হয় ধলাশাড়ী। কালের বিবর্তনে ধলাশাড়ী থেকে নাম হয় ধলেশ্বরী। বুড়িগঙ্গা-ধলেশ্বরীর মোহনায় নৌকা ডুবিতে মারা যায় নবাব সিরাজদ্দৌলার খালা ঘোষেটি বেগম। একাত্তরের ২৯ নভেম্বর ১৩৯ জন মুক্তিকামী সন্তানের নিশংস হত্যার সাক্ষী এই বুড়িগঙ্গা-ধলেশ্বরী।

জানা-অজানা বহু ঘটনার সিঁড়ি বেয়ে গড়ে উঠে পলি বিধৌত বক্তাবলী আলীরটেক পরগণা। যা নারায়ণগঞ্জের শস্য ভান্ডার বলে খ্যাত। এখানে এই মাটিতে বহু জ্ঞানীগুনীর জন্ম হয়েছে। পল্লী মাটিতে গড়া এই পরগণার মানুষের মন মানসিকতা ও প্রেমেসিক্ত। নদীঘেরা এই বক্তাবলী আলীরটেকে ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালে নিরাপদ আশ্রয় জেনে শত শত মুক্তিকামী মানুষ আশ্রয় নেয়। সেই কালো রাত ১৯৭১ সালের ২৯ নভেম্বর নারায়ণগঞ্জের বুড়িগঙ্গা-ধলেশ্বরী বিধৌত বক্তাবলী আলীরটেক এলাকায় রাতের অন্ধকারে আলবদর আর রাজাকারদের সহযোগিতায় পাক সেনারা ১৩৯ জনকে হত্যা করে।

দুঃখী প্রিয়জনহারা সেই থেকে ২৯ নভেম্বরকে শোক দিবস পালনের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করে থাকে। বক্তাবলী আলীরটেক এর ইতিহাস বড়ই করুণ, হৃদয়বিদারক! যারা সে দিনের পাকবাহিনীর তান্ডবলীলা প্রত্যক্ষ করেছেন তাদের মাঝে হাজার হাজার এলাকাবাসী সেই করুণ দৃশ্যের সাক্ষী হিসাবে স্বজনহারাদের বেদনা বুকে নিয়ে বেঁচে আছেন। সেদিনের বর্বরদের পৈশাচিক নির্যাতন, হত্যাকান্ড, নজিরবিহীন তান্ডবলীলার কথা মনে করে, কান্নায় আজো তাদের দু’চোখ বেয়ে অশ্রু ঝরে। সন্তানহারা মা, ভাইহারা বোন, স্বামীহারা স্ত্রী নিশীথ রাতের কোলে চুপি চুপি চোখের জল ফেলে। সে জল বুড়িগঙ্গা-ধলেশ্বরীর বুক বেয়ে চলে নিরবধি। মহান মুক্তিযুদ্ধের শহীদ প্রাণকে শ্রদ্ধায় স্মরণ করে সান্তনা খুঁজে বক্তাবলী আলীর টেকবাসী।

শহর থেকে দূরে নদীঘেরা পল্লী এলাকা বক্তাবলী। ৪০ হাজার কৃষক পরিবারের বাস। অনেকেই নিরাপদ আশ্রয় ভেবে ঠাঁই নিয়েছিলো বুড়িগঙ্গা-ধলেশ্বরী বেষ্টিত আলীরটেক বক্তাবলী পরগনায়। গভীর রাতে সমস্ত মানুষ শীতের কুয়াশায় ঘুমে বিভোর। ঘুমন্ত লোকালয়ে হঠাৎ বৃষ্টির মত গুলির শব্দ। চারদিকে আলবদর-রাজাকার আর পাক সেনার দল। হায়েনার মতো গণহত্যা, নারী লুন্ঠন, শিশু হত্যা করে যাচ্ছে। বসতঘর জ্বালিয়ে দিচ্ছে আগুনে। আগুনের লেলিহান শিখা, আর নারী-পুরুষের গগনবিদারিত চিৎকারে সমস্ত আকাশ-বাতাস হলো প্রকম্পিত। পাক হায়েনার দল গণধর্ষণ থেকে শুরু করে একে একে হত্যা করলো ১৩৯টি মুক্তিকামী আদম সন্তান। তাদের রক্তের দাগ আজো মুছেনি। বছর শেষে তাঁদের কথা মনে করে আজও মা তার প্রিয় সন্তানের জন্য হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে। ভাই তার শহীদ ভাইদের জন্য হঠাৎ কাজের ফাঁকে চিৎকার দেয়। স্ত্রী তার স্বামীর জন্য স্মৃতির প্রহর গোনে।

পিতাহারা শহীদের সন্তানেরা জানতে চায় তাদের পিতা কোথায়? হাতের শাকা, কপালের সিঁদুর, নাকের নাকফুল হারিয়ে গেছে এই হত্যাযজ্ঞের পৈশাচিক নিষ্ঠুরতায়। নজিরবিহীন এই ইতিহাস আগামী প্রজন্ম কতটুকু মূল্যায়ন করবে তা কে জানে! সেই শহীদের স্মৃতিটুকু আজও অযত্নে অবহেলায় হাহাকার করে। মা জানে তাঁর সন্তানহারা বেদনা, স্ত্রী জানে তাঁর স্বামী হারানোর কষ্ট, বোন জানে তাঁর ভাই হারানোর দুঃখ। মাটির কাছে আজ শহীদদের প্রশ্ন ওরা কি রাখবে মনে আমায়? আজও সেই বুড়িগঙ্গা-ধলেশ্বরীর মোহনায় শহীদের আত্মার কান্না শোনা যায়।

লেখক-
রণজিৎ মোদক
শিক্ষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট

আপনার মন্তব্য লিখুন............