কলড্রপের ক্ষতিপূরণ গ্রাহকরা পাচ্ছে না কেন?

0
62
কলড্রপের ক্ষতিপূরণ গ্রহকরা পাচ্ছে না কেন?
শামীম শিকদার

শামীম শিকদার : প্রযুক্তির সুদূরপ্রসারী বিস্তারের মাধ্যমে মানুষের দৈনন্দিন জীবন হয়ে উঠছে সহজ। সকল ক্ষেত্রের পাশাপাশি নেটওয়ারকিং ক্ষেত্রেও বেড়েছে প্রযুক্তির ছোঁয়া। থ্রি জি’র পর ‘ফোর জি’ কে ছাড়িয়ে চলছে ‘ফাইভ জি’ বিস্তারের কাজ। ফোরজির কথা বলা হলেও জেলা শহরগুলোয় টুজিতেই সীমাবদ্ধ ডেটা সার্ভিস সেবা। খোদ রাজধানীতেই ফোরজি সিমে আসছে টুজি সিগন্যাল। ইন্টারনেট সার্ভিসেও সন্তুষ্ট নন গ্রাহক। ফোরজির টাকা পরিশোধ করা হলেও দেওয়া হয় না কাঙ্খিত গতি। কারণে-অকারণে সার্ভিসের নামে বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে সংযোগ। মাস শেষে খারাপ সেবায়ও ঠিকই টাকা গুনতে হচ্ছে গ্রাহকদের। গ্রাহক সেবাকেন্দ্রে অভিযোগ করেও মিলছে না কোনো প্রতিকার।

বিটিআরসির তথ্যানুসারে, মোবাইল ফোনের গ্রাহক সংখ্যা প্রায় ১৩ কোটি। তাদের মাঝে মোবাইলে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ৬ কোটি ৩১ লক্ষ। অন্যদিকে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন মোবাইল ফোনের গ্রাহকরা। মোবাইল ফোন অপারেটর গুলোর বেপোরোয়া মনোভাবে কল ড্রপ যেমন বেড়েছে, পাশাপাশি মোবাইল ফোনের কিছু সার্ভিসে বিরক্ত হচ্ছেন গ্রাহক।

বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) থেকে পাঠানো এক নির্দেশনায় বলা আছে, ‘রাত ১২টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত কোন প্রচারণামূলক ফোন করা বা এসএমএস পাঠানো যাবে না।’ এই নির্দেশনার তোয়াক্কাই করছে না অপারেটরগুলো। সময়ে-অসময়ে গভীর রাতে পাঠানো মোবাইল ফোন অপারেটরদের প্রচারণামূলক এসএমএসের অতিষ্ট হচ্ছে মানুষ। বিটিআরসি মোবাইল ফোন অপারেটরদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে কলড্রপের গ্রহণযোগ্য সর্বোচ্চ সীমা ২ শতাংশ নির্ধারণ করে দেয় এর বেশি কলড্রপ হলে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেয়। বাংলাদেশে মোবাইল অপারেটরগুলি দাবি করেছে তাদের কলড্রপের হার ১ শতাংশের বেশি নয়। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় ভিন্ন চিত্র।

টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থার মতে ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর হতে ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কলড্রপের মাত্রা ছিল ২২১ কোটি। যার মধ্যে গ্রামীণফোনের কলড্রপের সংখ্যা ১০৩ কোটি। দ্বিতীয় স্থানে থাকা রবির কলড্রপ ৭৬ কোটি, বাংলালিংকের কলড্রপ ৩৬ কোটি এবং রাষ্ট্রায়ত্ত অপারেটর টেলিটকের কলড্রপ ৬ কোটি।

২০১৬ সালের জুনে বিটিআরসির নির্দেশনা অনুযায়ী কোন মোবাইল সংযোগ হতে দিনে একাধিকবার কলড্রপ হলে এক মিনিটি টকটাইম গ্রাহককে ফিরিয়ে দিতে হবে এবং তা এসএমএসের মাধ্যমে জানাতে হবে। ২০১৬ সালের জুলাই মাস থেকে এ ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথা ছিল; কিন্তু তা কার্যকর না হওয়ায় ওই বছরের ২২ আগস্ট ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগে মোবাইল ফোন অপারেটরদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করে গ্রাহকদের কলড্রপের ক্ষতিপূরণ দিতে তাগাদা দেওয়া হয়। কিন্তু সে তাগাদায়ও সুফল মেলেনি।

সর্বশেষ ২০১৬ সালের ২২ নভেম্বর বিটিআরসি মোবাইল ফোন অপারেটরদের বিরুদ্ধে অভিযোগ সম্পর্কে গণশুনানির আয়োজন করলে ওই শুনানিতে গ্রাহকদের পক্ষ থেকে বলা হয়, বর্তমানে কলড্রপ আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেড়েছে। বিটিআরসির কাছে গ্রাহকের সর্বাধিক অভিযোগ কলড্রপ নিয়ে। কাউকে কল দেওয়ার পর ঠিকমতো কথা বলা যায় না; কিংবা একপ্রান্তের গ্রাহক কথা বললেও অন্যপ্রান্তের গ্রাহক শুনতে পান না। ফলে ফের কল করতে হয় এবং গচ্ছা যায় অতিরিক্ত টাকা। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে আরেক বিড়ম্বনা মিউট কল। এক্ষেত্রে হ্যান্ডসেটের পর্দায় এয়ারটাইম মিনিট গতিশীল থাকলেও কিছুই শোনা যায় না। অথচ অর্থ গচ্ছা যায়।

এ ছাড়া ইন্টারনেটের গতি নিয়ে প্রতারণা, ইন্টারনেট ঠিকমতো কাজ না করলেও বিল কেটে রাখা, বিভিন্ন প্যাকেজ একবার চালু হওয়ার পর বন্ধ না হওয়া, এসএমএসের যন্ত্রণা, নেটওয়ার্ক থাকা না-থাকা, স্থানে স্থানে কভারেজ না থাকা, বিভিন্ন প্যাকেজ বিল নিয়ে প্রতারণাসংক্রান্ত আরও অনেক অভিযোগ রয়েছে। যা প্রতিকারের কোনো ব্যবস্থা নেই।

কলড্রপ প্রতিরোধে মোবাইন অপারেটরগুলিকে সচেতনাতামূলক ভূমিকা পালন করতে হবে। কলড্রপ নিয়ন্ত্রণে রাখার সর্বউচ্চ প্রচেষ্টা বাজায় রাখতে হবে। সর্বউচ্চ সচেতনতার মাধ্যমেই যদি কলড্রপ হয় তবে গ্রাহকের ক্ষতিপূরণ হিসেবে এক মিনিট টকটাইম ফিরিয়ে দিয়ে তা এসএমএসের মাধমে জানিয়ে দিতে হবে। তাছাড়া অনেকেই কলড্রপের সাথে পরিচিত নয়, তাই তাদের অজান্তেই মোবাইল অপারেটর গুলো হাতিয়ে নিচ্ছে তাদের ইচ্ছা মতো অর্থ। কলড্রপ নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য মোবাইল ফোন অপারেটরগুলির সচেতনামূলক ভূমিকার পাশাপাশি গ্রহকদের সচেতন হতে হবে এবং সংশৃষ্ট কতৃপক্ষকে তা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

লেখক : শামীম শিকদার
সাহিত্যিক ও সাংবাদিক
ভাকোয়াদী, কাপাসিয়া, গাজীপুর

আপনার মন্তব্য লিখুন............

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here