নিখোঁজ স্বজনের সন্ধান চেয়ে কাঁদলেন তারা

0
69
নিখোঁজ স্বজনের সন্ধান চেয়ে কাঁদলেন তারা

অনলাইন ডেস্ক : হারিয়ে যাওয়া প্রিয় মানুষটি বেঁচে আছেন কি-না জানেন না তারা। স্বজন নিখোঁজ হওয়ার পর অনেক খুঁজেছেন, পাননি। এখন তাদের প্রশ্ন, কীভাবে দাবি জানালে, কার কাছে গেলে হারিয়ে যাওয়া সন্তান, ভাই, স্বামী, বাবার খোঁজ পাওয়া যাবে? গত কয়েক বছরে নিখোঁজ হওয়া ২২ জনের পরিবারের সদস্যদের সংগঠন ‘মায়ের ডাক’ আয়োজিত আলোচনা সভায় এভাবেই আহাজারি করেছেন, কান্নায় ভেঙে পড়েছেন নিখোঁজ মাসুমের মা, সুমনের বোন, সোহেলের শিশুসন্তান, এরশাদ আলীর বাবাসহ অনেকে।

অনুষ্ঠানে আলোচনায় অংশ নিয়ে নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, আমরা গল্প শুনতাম রাক্ষস মানুষ খায়। এখন সরকার সেই রাক্ষসের ভূমিকায়, এ সরকারের লোকজন মানুষ খেয়ে ফেলছে।

ঢাকা মহানগরের ২৫ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নিখোঁজ সাজেদুল ইসলাম সুমনের মা হাজেরা বেগমের সভাপতিত্বে মঙ্গলবার জাতীয় প্রেসক্লাবে আলোচনা সভায় আরও বক্তব্য দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল, বাসদের খালেকুজ্জামান ভূঁইয়া, গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান জোনায়েদ সাকি, গণমুক্তি কাউন্সিলের সাধারণ সম্পাদক ফয়জুল হাকিম লালা এবং বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য তাবিথ আউয়াল। আলোচনা সভায় টানানো ব্যানার ও প্ল্যাকার্ডে দেশে ক্রসফায়ার এবং গুম বন্ধে রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহারে সুস্পষ্ট ঘোষণার দাবি জানানো হয়।

অনুষ্ঠানে প্রথমেই বক্তব্য দেন নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যরা। নিখোঁজ আব্দুল কাদের মিয়া মাসুমের মা আয়েশা বেগম কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন, সন্তানই আমার সবচেয়ে বড় সম্পদ। সন্তান হারিয়ে আমি এখন নিঃস্ব। নতুন বছরে সন্তানকে ফেরত পাওয়ার নিশ্চয়তা চাই।

সাজেদুল ইসলাম সুমনের বোন মারুফা ইসলাম ফেরদৌসী বলেন, এখানে ২২ পরিবারের সদস্যরা আছেন। এই পরিবারগুলো প্রিয় মানুষ হারিয়ে বুকে পাথর চেপে দিন কাটাচ্ছে। তাদের সবার একটাই দাবি, একই প্রত্যাশা, প্রিয় স্বজন ফিরে আসুক। এ সময় সুমনের মেয়ে রাইদা চিৎকার করে কেঁদে বলেন, এ কেমন দেশ? বাবাকে খুঁজতে সব জায়গায় গেছি, কেউ খোঁজ দিতে পারেনি। এ দেশে কি বাবাকে আর খুঁজে পাওয়া যাবে না?

আরেকজন নিখোঁজ সোহেলের ছোট্ট মেয়ে সাফা এ সময় ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে বলে, ‘এক বছর ধরে বাবা নেই, তাই একদম ভালো লাগে না। বাবাকে ছাড়া স্কুলে যেতেও ইচ্ছে করে না।’ একই সঙ্গে কেঁদে ওঠে প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয় নিখোঁজ মারুফ জামানের শিশুসন্তান সামিরা। সে বলে, ‘এক বছর ধরে বাবা আসছে না, বাবাকে পাচ্ছি না, কেন পাচ্ছি না, আপনারা কিছু বলেন না কেন?’

নিখোঁজ সেলিম রেজা পিন্টুর বোন রেহানা বেগম আকুতি জানিয়ে বলেন, ‘কিছুই চাই না, শুধু ভাইটাকে ফেরত দেন’। নিখোঁজ এরশাদ আলীর বাবা মাহবুব আলী কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘বৃদ্ধ বয়সে সন্তান হারানোর মতো সর্বনাশের শিকার হলাম। আমার ছেলেটাকে কি আর কখনও ফিরে পাব না?’

আলোচনায় অংশ নিয়ে বেদনার্ত স্বজনের উদ্দেশে মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, কেঁদে কী হবে? এ সরকারের কেউ আপনাদের কথা শুনবে না। এ সরকারে যারা দায়িত্বে আছেন তারা সম্পূর্ণ দায়িত্বজ্ঞানহীন, মানুষের জন্য তাদের কোনো দরদ নেই। আমরা গল্প শুনতাম রাক্ষস মানুষ খায়। এখন এই সরকার রাক্ষসের ভূমিকায়, সরকারের লোকজন মানুষ খেয়ে ফেলছে।

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের অন্যতম নেতা মান্না আরও বলেন, এখন যেভাবে স্বজনের ছবি বুকে নিয়ে এসেছেন, এভাবে বুকের ভেতরে ছবি, প্ল্যাকার্ড নিয়ে এলাকায় যান। সবাইকে বলুন, শপথ নিন- যারা মানুষ গুম করে তাদের ভোটের মাধ্যমে পরাজিত করতে হবে। আপনাদের কান্নাকে বারুদে পরিণত করুন।

ড. আসিফ নজরুল বলেন, পৃথিবীর সব দেশের আইনেই গুম জঘন্যতম অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত আছে। গুম খুনের চেয়েও জঘন্যতম অপরাধ। একাধিক আন্তর্জাতিক আইনে বলা হয়েছে, গুম যখন পরিকল্পিতভাবে হয় এবং অধিক সংখ্যায় হয় তখন সেটা মানবতাবিরোধী অপরাধ। দেশে যারা গুমের শিকার হয়েছেন তারা সবাই সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী। এ কারণে এটা বিশ্বাস করার যথেষ্ট কারণ আছে যে এসব গুম পরিকল্পিতভাবে হয়েছে এবং গুমের সংখ্যাও অনেক।

খালেকুজ্জামান বলেন, কোনো সুস্থ চিন্তার মানুষ, সভ্য মানুষ এভাবে গুমের ঘটনা মেনে নিতে পারে না। গুমের বিচার হতেই হবে।

জোনায়েদ সাকি বলেন, কান্না, হাহাকার ও অন্তরের রক্তক্ষরণের মধ্যেই আমরা সবাই আছি।

তাবিথ আউয়াল বলেন, গুমের জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না বলেই গুম বন্ধ হচ্ছে না।

নিউজটি শেয়ার করুন :

আপনার মন্তব্য লিখুন............