পবিত্র লাইলাতুল বরাত-রমযান পূর্ব ওরিয়েন্টেশন ইবাদত

0
112
পবিত্র লাইলাতুল বরাত-রমযান পূর্ব ওরিয়েন্টেশন ইবাদত

কামাল সিদ্দিকী : শবে বরাত মুসলমানদের অন্যতম ধর্মীয় উৎসব। আরবি শাবান মাসের ১৪ তারিখ দিবাগত রাতে অর্থাৎ ১৫ই শাবান রাতে মুসলমানগণ অত্যন্ত ভাবগাম্বির্যভাবে আল্লাহর ইবাদত-নফল নামায, তাসবিহ-তাহলিল, জিকির, কুরআন তেলোয়াত, কবর জিয়ারত ও দান খয়রাতের মাধ্যমে কাটায়। পবিত্র হাদিসে যা নেসফুস শাবান নামে উল্লেখ রয়েছে আমাদের দেশে যা শবেবরাত বা লাইলাতুল বারাত নামে পরিচিতি লাভ করেছে। পবিত্র কোরআনে শবে বরাত সম্পর্কে কোন তথ্য পাওয়া যায় না। তবে হাদীসের মাধ্যমে নেসফুস শাবান এর গুরুত্ব ও ফজিলাত সম্পর্কে জানা যায়। হযরত আয়েসা (রাঃ) থেকে এক দীর্ঘহাদিস বর্ণিত হয়েছে তাতে তিনি বলেন যে, আমি একদা রাসুল (সাঃ) কে খুঁজে পাচ্ছিলাম না। তখন আমি তাঁকে খুঁজতে বেরিয়ে দেখি যে, তিনি জান্নাতে বাকিতে আকাশের দিকে হাত উত্তোলন করে দোয়া করছেন।

আয়েশাকে দেখে তিনি বললেন- তুমি কি মনে করেছ যে, আল্লাহ ও তাঁর রাসুল তোমার উপর জুলুম করেছেন। হযরত আয়শা (রাঃ) বলেন যে, আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল, আমি ধারণা করেছিলাম যে ,আপনি আপনার অন্য কোন স্ত্রীর কাছে পদার্পন করেছেন। তখন রাসুল (সাঃ) বললেন, শাবান মাসের মধ্যরাতে আল্লাহ তায়ালা প্রথম আকাশে অবতীর্ণ হন। অতঃপর বিশাল সংখ্যক মানুষকে তিনি ক্ষমা করে দেন। [তিরমিযি, ইবনে মাজাহ]

অপর এক হাদিসে আল্লাহর রাসুল (সাঃ) বলেন, রজব ও রমজান মাসের মধ্যবর্তী এই শাবান মাস সম্পর্কে লোকজন গাফেল থাকে অথচ এ মাসে মানুষের আমল আল্লাহ রাব্বুল আ’লামিনের দরবারে উপস্থাপন করা হয়। [আহমদ, নাসায়ী]

এ মাসের মধ্যবর্তীরাত বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ। এ সম্পর্কীত হাদীসগুলোর মধ্যে বর্ণনার ধারাবাহিকতা ও বিশুদ্ধতার শর্ত পূরণের দিক দিয়ে সর্বাধিক বিশুদ্ধ হাদিস বর্ণনাকারী আবু মুসা আশয়ারী (রাঃ)। তিনি বলেন, মহান আল্লাহ শাবানের মধ্যবর্তী রাতে তাঁর সৃষ্টির মুখোমুখি হন এবং মুশরিক ও ঝগড়া ফাসাদকারী ব্যতীত সকলকে ক্ষমা করে দেন। [ইবনু মাজাহ]

উপর্যুক্ত হাদিসসমূহের দ্বারা আমরা শাবান মাসের গুরুত্ব ও তাৎপর্য উপলব্ধি করতে পারি। পবিত্র শবেবরাতের পনের দিন পর সর্বোৎকৃষ্ট মাস রমজান শুরূ হয় । যে মাসে মুসলমানগণ সিয়ামসাধনার মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভে সচেষ্ট হন।

পবিত্র রমজান একটি পূর্ণাঙ্গ প্রশিক্ষণ তথা সাধনার মাস। দীর্ঘ একমাস বিশেষ নিয়মরীতির মাধ্যমে ঈমানদারগণ সিয়াম সাধনা করে আল্লাহর রেজামন্দি হাসেল করেন। পবিত্র শবেকদর এ মাসে। যা হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম বলে পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে। পবিত্র কুরআন এ মাসে এবং শবেকদর রাতেই অবর্তীর্ণ হয়েছে। এ রমজান মাসের গুরুত্ব উপলদ্ধির জন্য তথা মুসলমানগণ যাতে রমজানের রোযাগুলো যথাযথভাবে পালন করতে পারে তারই প্রশিক্ষণ স্বরূপ শবে বরাতের প্রি-ট্রেনিং বা অরিয়েন্টেশন-ইবাদত। পবিত্র শবে বরাতের পনের দিন পূর্বে শবে মে’রাজ। যে রাতে আল্লাহর রাসুল (সাঃ)কে আল্লাহ তা’য়ালা সপ্ত আকাশ পাড়ি দিয়ে নিজের নৈকট্য লাভ করিয়েছিলেন এবং মহানবী (সাঃ) কে বেহেস্ত -দোযখ দেখিয়ে ইসলামের অন্যতম স্তম্ভ পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ এর বাধ্যবাধকতা করে দেন। যে নামাজের পূর্ণাঙ্গ রিহার্সেল চলে পবিত্র শবে বরাত ও পবিত্র রমজান মাসের বিভিন্ন নফল নামাজের মাধ্যমে।

এ নফল নামায মূলতঃ ফরয নামাযের সৌন্দর্য বৃদ্ধি এবং ত্রুটি- বিচ্যুতি দূর করে থাকে। তাই পবিত্র কোরআনে শবে বরাতের ঊল্লেখ না থাকলেও আমরা এর গুরুত্বকে খাঁটো করে দেখতে পারি না। আসলে আমাদের দেশে এ রাতে মসজিদে মানুষের ঢল দেখে একথা বলা যায় যে, মানুষ কিছুটা হলেও আল্লাহকে ভয় করে। আর ভয় করে বলেই অন্তত বছরে একবার হলেও মসজিদে যায়। আমরা এটাকে কোন ক্রমেই ছোট করে দেখতে পারি না। কারণ এক রাতের ইবাদত কবুল হয়ে হয়ত ঐ ব্যক্তি সমগ্র জীবনের জন্য পূর্ণাঙ্গ নামাযি হয়ে যেতে পারেন। তবে পবিত্র রাতে ইবাদতের নামে যে ধরনের শরীয়ত বিরোধী কার্যকলাপ চলে তা মোটেই কাম্য নয়। বিশেষ করে এক শ্রেণীর উচ্ছৃংখল লোকজন নফল ইবাদত না করে রিকশা -ভ্যানে চড়ে রাস্তায় রাস্তায় হৈ-চৈ করে বেড়ায়। অনেকে বিভিন্ন মাজার শরীফের আস্তানায় গিয়ে গাজা টেনে পবিত্র মাজারের পবিত্রতা নষ্ট করে। আবার পোটকা-বোমাবাজির মাধ্যমে মুসল্লিগণের ইবাদতের বিঘ্ন ঘটায়।

এ ব্যাপারে স্মরণ করা যেতে পারে যে, বছর কয়েক আগে পবিত্র শাবানের রাতে কিছু যুবক ঢাকার অদূরে আড্ডা দিতে যেয়ে গ্রামবাসির হাতে নির্মমভাবে নিহত হয়। তাই এ ব্যাপেরে অভিভাবকসহ সংশ্লিষ্ট সকলকে সচেতন হতে হবে। তরুন-যুবকদের শবে বরাতের সঠিক বুঝ দেবার চেষ্টা করতে হবে। আল্লাহ আমাদের সকলকে পবিত্র শবে বরাত যথাযথভাবে পালন করার তৌফিক দিন।

লেখক- কামাল সিদ্দিকী
কবি ও কলামিস্ট।

নিউজটি শেয়ার করুন :

আপনার মন্তব্য লিখুন............