পৌষ সংক্রান্তির ইতিবৃত্ত

পৌষ সংক্রান্তির ইতিবৃত্ত

রণজিৎ মোদক : আজ পৌষ সংক্রান্তি। পৌষ পার্বণ দধি সংক্রান্তি ব্রত ও মকর আদি স্নান উৎসব। সনাতন ধর্মালম্বীদের দৃষ্টিতে পৃথিবী-পবিত্রকারিণী গঙ্গা হিমালয়ের গঙ্গোত্রী থেকে বঙ্গোপসাগরের গঙ্গাসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত। তাঁর কিছু শাখানদী যেমন, পদ্মা অন্যত্র দৃষ্ট হয়। কিন্তু গঙ্গোত্রী গঙ্গার মূল উৎপত্তি স্থান নয় এবং গঙ্গাসাগরই তাঁর শেষ নয়। এই তিথিকে লক্ষ্য করে বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় মকর সংক্রান্তি স্নান ও ঘুড়ি উড়ানো উৎসব অনুষ্ঠিত হচ্ছে। একে ভগীরথের উৎসবও বলা হয়।

হিন্দু শাস্ত্রীয় মতে জানা যায়, সত্যযুগে অসুররাজ বলী যখন দেবতাদের পরাজিত করে স্বর্গরাজ্য দখল করে মহানন্দে এক বিশাল যজ্ঞের আয়োজন করলেন, তখন দেবতাদের অনুরোধে ভগবান বিষ্ণু বামনরূপ ধারণ করে বলীমহারাজের যজ্ঞস্থলীতে উপনীত হলেন। উদ্দেশ্য ছিল স্বর্গরাজ্য পুনরুদ্ধার করে দেবতাদের হাতে সমর্পণ করা। বলীমহারাজ কাছে বামনদেব মাত্র তিন পদক্ষেত্র ভূমি ভিক্ষা করেছিলেন। বলীমহারাজ যখন স্বীকৃত হলেন, তখন তিনি তাঁর প্রথম পদক্ষেপ দিয়েই উর্ধ্বলোকের সমস্ত গ্রহ-নক্ষত্র দখল করলেন। বামনদেবের চরণ কমলের বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ ব্রহ্মা-ের আবরণ ভেদ করে সমুদ্রের জলকে স্পর্শ করল। সেখান থেকে মাত্র এক ফোঁটা জল এই ব্রহ্মাণ্ডে প্রবেশ করল। ব্রহ্মা সেই এক ফোঁটা জলকে তাঁর কম-লুতে ধারণ করলেন। লক্ষ কোটি বছর ধরে স্বর্গ মর্ত্য এবং পাতালের অসংখ্য গ্রহ-নক্ষত্রকে প্লাবিত করছে যে এক ফোঁটা জল, তাঁরই নাম দেবী গঙ্গা। হরিশ্চন্দ্রের বংশপরম্পরায় উদ্ভূত মহারাজ ভগীরথ এই গঙ্গাকে পৃথিবীতে আনয়ন করেছিলেন।

প্রথম শর্ত, কোনো সমর্থ ব্যাক্তিকে তাঁর বেগ ধারণ করতে হবে। তা না হলে তাঁর বেগ মর্ত্যলোককে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেবে। দ্বিতীয় শর্ত সমস্ত পাপী ব্যাক্তিরা গঙ্গায় স্নান করবে, কিন্তু সেই পাপের বোঝা যেন তাঁকে বইতে না হয়। ভগীরথ এই শর্ত পূরণের জন্য শিবকে প্রসন্ন করলেন। শিব জানতেন গঙ্গা হচ্ছেন ভগবানের চরণ জল। তাই তিনি সানন্দে গঙ্গাকে তাঁর মস্তকে ধারণ করেছিলেন। আর ভগীরথ মা গঙ্গাকে বলেছিলেন যে, পৃথিবীর শুদ্ধ বৈষ্ণবেরা যখন গঙ্গায় স্নান করবেন, তখন তিনিও পাপীদের পরিত্যক্ত পাপ থেকে মুক্ত হবেন।

কৈলাসে শিবের মস্তক থেকে গঙ্গা আকাশগঙ্গা রূপে চন্দ্রলোকে পতিত হন। সেখানে থেকে মেরু পর্বতে পতিত হয়ে সেখানে বহু শাখায় বিভক্ত হয়ে অবশেষে কপিলমুনি যে পথে হিমালয় থেকে গঙ্গা সাগরে গিয়েছিলেন, সেই পথ ধরে তিনি বর্তমান গঙ্গাসাগরে এলেন। সগর মহারাজের ষাট হাজার পুত্র তখন সূক্ষরূপে রসাতলে অবস্থান করেছিলেন। গঙ্গাও তাই পুনরায় আকাশমার্গে রসাতলে গমন করলেন। গঙ্গার দিব্য জলের স্পর্শে সগর মহারাজের ষাট হাজার পুত্র মুক্ত হলেন। এরপর থেকে নিম্নলোকে তিনি ভোগবতী গঙ্গা নামে প্রবাহিত হয়ে রসাতলের তলদেশ থেকে ব্রহ্মাণ্ড ভেদ করে পুনরায় কারণ সমুদ্রে গিয়ে মিশলেন। তখন থেকে পতিততারিণী গঙ্গা একইভাবে ত্রিভুবনের সমস্ত পাপী-তাপীকে পাপমুক্ত করে চলেছেন। গঙ্গার নাম উচ্চারণের মাধ্যমেও জীব পবিত্র হয়। গঙ্গায় দেহত্যাগের ফলে তুচ্ছ জীবেরও মহৎগতি লাভ সম্ভব হলে, যারা শুদ্ধ ঐকান্তিকভাবে গঙ্গাস্নান করেন, তারা অবশ্যই পরমগতি লাভ করবেন।

মকর সংক্রান্তি তিথিতে সূর্য মকর রাশিতে প্রবেশ করে এবং মাঘ মাস শুরু হয়। এটি উত্তরায়ণ সংক্রান্তি নামেও পরিচিত, কারণ এদিন থেকে উত্তরায়ণ কাল তথা স্বর্গলোকে দিবাকাল শুরু হয়। ছয় মাস উত্তরায়ণ দেবালোকে দিবা এবং ছয় মাস দক্ষিণায়ণ রাত্রি। সত্যযুগে এই তিথিতে গঙ্গাদেবী গঙ্গা সাগর সঙ্গমস্থলে সমুদ্রে প্রবেশ করেন এবং সগরপুত্রদের উদ্ধার করেন। তাই এই তিথি পরমপবিত্র এবং পুণ্যদায়িনী। সেজন্য আজও গঙ্গাসাগরে এই তিথিতে স্নান এবং তদুপলক্ষে মেলা ও উৎসব অনুষ্ঠিত হয় এবং দূর-দূরান্ত থেকে তীর্থযাত্রী এবং সাধুবাদের সমাগম হয়।

লেখক : রণজিৎ মোদক
শিক্ষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

আপনার মন্তব্য লিখুন............