বঙ্গবন্ধুর খুনীদের প্রেতাত্মারা দেশের শান্তি ও প্রগতির বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে : প্রধানমন্ত্রী

0
45
বঙ্গবন্ধুর খুনীদের প্রেতাত্মারা দেশের শান্তি ও প্রগতির বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে : প্রধানমন্ত্রী

শব্দপাতা ডেস্ক : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, যুদ্ধাপরাধী এবং বঙ্গবন্ধুর খুনীদের প্রেতাত্মারা এখন দেশের শান্তি ও প্রগতির বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘কুচক্রী মহল ও তথাকথিত কিছু সুশীল সমাজের প্রতিনিধি এবং কতিপয় বুদ্ধিজীবী দুজন স্কুল শিক্ষার্থীর বাসচাপায় মর্মান্তিক মৃত্যুকে কেন্দ্র করে বিক্ষোভকারী কোমলমতিদের অনভূতিকে কাজে লাগিয়ে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের পাঁয়তারা করেছিল।’

তিনি বলেন ‘তারা তাদের ঘাড়ে পা রেখে ক্ষমতায় যাওয়ার চক্রান্ত করেছিল। কিন্তু এর ফলে কোমলমতিদের বড়ধরনের কোন ক্ষতি হয়ে যেতে পারে তা তারা চিন্তা করেনি।

শোকের মাস আগস্টের শেষ দিনে আজ বিকেলে গণভবনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশ ছাত্রলীগের শোক দিবসের আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির ভাষণে একথা বলেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ডিজিটাল বাংলাদেশ আমরাই করে দিয়েছি। সেই আধুনিক তথ্য প্রযুক্তির সুযোগ নিয়ে ষড়যন্ত্রকারীরা সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে মিথ্যা তথ্য সরবরাহ করে ফায়দা লুটতে চেয়েছিল।

প্রধানমন্ত্রী নিরাপদ সড়কের দাবিতে স্কুল শিক্ষার্থীদের চলমান আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার ক্ষেত্রে নেপথ্য ব্যক্তিদের গ্রেফতার প্রসঙ্গে বলেন, তথাকথিত সুশীল সমাজের একটি অংশ এখন গ্রেফতার হওয়া ষড়যন্ত্রকারীদের ছাড়াতে মায়াকান্না করছে, এমনকি বৈশ্বিকভাবেও সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টির অপচেষ্টা চালাচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘কিন্তু সবার একটা বিষয় অবশ্যই মাথায় রাখা উচিত সরকার নীতির প্রশ্নে কোন চাপের কাছেই নতি স্বীকার করবে না’।

বাংলাদেশ ছাত্রলীগ সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন এবং সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানীও অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন।

প্রধানমন্ত্রী ছাত্রলীগ নেতৃবৃন্দকে পড়ালেখায় মনোনিবেশের পাশাপাশি পদের প্রতি মোহ থেকে নয় আদর্শ ভিত্তিক রাজনীতিতে আত্মনিবেদন করার আহবান জানিয়ে বলেন, তিনি এবং তাঁর ভাই শেখ কামাল ও ছাত্রলীগের রাজনীতি করেছেন। একজন কর্মীর মত কাজ করেছেন, যে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে তা সম্পাদন করেছেন। কিন্তু পদের দিকে তাকাননি।

জাতির পিতা রাজনীতির জন্য জীবনের সর্বস্ব ত্যাগ করেছিলেন উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনগণের কথা চিন্তা করে, তাদের কল্যাণের কথা ভেবে, তাদের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য যারা রাজনীতি করেন ইতিহাস তাদেরই স্বীকৃতি দেয়। ইতিহাস তাদেরই মর্যাদা দেয়। ইতিহাসে তাদেরই নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকে এবং শত চেষ্টা করেও সে নাম মোছা যায় না। আর সেই দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

সমকালীন রাজনীতির উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, অথচ একজন রাজনীতি করেন শুধু নিজেকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য, কেউ রাজনীতি করেন রাজনীতির ছত্রচ্ছায়ায় অর্থ সম্পদের মালিক হওয়ার জন্য, কেউ করেন সামাজিকভাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আদর্শবানদের রাজনীতি শুধু অনুকরণ নয়, অনুশীলনের চেষ্টা করলেই দেশকে কিছু দেয়া যায়।’

শেখ হাসিনা বলেন, একজন রাজনীতিকের জীবনে শুধু এই চিন্তা-চেতনাই থাকা উচিত- কি পেলাম কি পেলাম না, রাজনীতি শুধু সে হিসেব কষার জন্য নয়, কি মূল্যায়ন পেলাম সে হিসেব কষার জন্য নয়, কতটুকু দেশকে দিতে পারলাম, কতটুকু মানুষের জন্য করতে পারলাম, কতটুকু মানুষকে দিয়ে যেতে পারলাম- সেখানেই সবচেয়ে বড় তৃপ্তি। সেটাই সব থেকে বড় পাওয়া।

তিনি বলেন, এইভাবে চিন্তা করে যারা রাজনীতি করে তাঁদের কিছু চাইতে হয় না, ইতিহাস তাঁদের মূল্যায়ন করে।

বঙ্গবন্ধুর ছায়াসঙ্গী বেগম মুজিবের জীবনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, বঙ্গমাতা কেবল সারা জীবন দিয়ে গেছেন, কিন্তু নিজের মর্যাদা নিয়ে কখনও চিন্তা করেননি। যে কারণে এদেশের রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রীর স্ত্রী হয়েও তিনি ধানমন্ডী ৩২ নম্বরের বাড়িতেই একটি সাধারণ মধ্যবিত্ত জীবন কাটিয়ে গেছেন।

ইতিহাসের সন্ধিক্ষণে যিনি কঠিন সিদ্ধান্ত দিতে পারেন, তিনিই ইতিহাস সৃষ্টি করেন উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী জাতির প্রযোজনে এই মহীয়সী নারীর কিছু যুগান্তকারী ভূমিকারও উল্লেখ করেন।

বেগম মুজিবের একটি সিদ্ধান্ত বাঙালিকে মুক্তির সংগ্রামে এগিয়ে যাওয়ার পথ দেখিয়েছিল উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী ’৬৯’র গণঅভ্যুত্থানের পেক্ষাপট স্মরণ করে বেগম মুজিবের পরামর্শে জাতির জনকের প্যারোলে মুক্তি নিয়ে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের সঙ্গে গোলটেবিল বৈঠকে যোগ দিতে না যাওয়ার স্মৃতিচারণ করেন।

তিনি বলেন, পাকিাস্তান সরকার আম্মাকে ভয় দেখান, বঙ্গবন্ধু প্যারোলে মুক্তি না নিলে তিনি বিধবা হবেন। অথচ, আম্মা সোজা বলে দিলেন, কোন প্যারোলে মুক্তি হবে না। নিঃশর্ত মুক্তি না দিলে কোন মুক্তি হবে না। প্যাারোলে মুক্তি নিলে মামলার আর ৩৪ জন আসামীর কি হবে।’
শেখ হাসিনা বলেন, গণঅভ্যুত্থানের ফলে পাকিস্তান সরকার আব্বাকে নিঃশর্ত মুক্তি দিতে বাধ্য হয়।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, এর আগে, ১৯৬৬ সালে বাঙালির মুক্তির সনদ ৬ দফা ঘোষণা করে জনমত সৃষ্টির জন্য সারাদেশে জনসভা করতে গিয়ে বঙ্গবন্ধু আট বার গ্রেফতার হন। তখন কতিপয় আওয়ামী লীগ নেতা ৬-দফাকে ৮-দফায় রূপান্তরের চেষ্টা বেগম মুজিবের জন্য ভেস্তে যায়।

তিনি বলেন, ৬ দফা আন্দোলনের সময় সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা, কারাবন্দিদের মুক্তির জন্য ৭ জুনের হরতাল সফল করা। সেটাও সফল হয়েছিল বেগম মুজিবের প্রচেষ্টায়। তিনি নিজ বাসা থেকে আত্মীয়ের বাসায় গিয়ে সেখান থেকে স্যান্ডেল আর বোরখা পরে জনসংযোগে বেরিয়ে পড়তেন।

আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের সময় বেগম মুজিব পুলিশ ও গোয়েন্দা চক্ষুর আড়ালে দলকে শক্তিশালী করেছেন। বিচক্ষণতার সঙ্গে ছাত্রদের তিনি নির্দেশনা দিতেন এবং অর্থ সরবরাহসহ প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করতেন। এমনকি নিজের গহনা বিক্রি করেও অর্থ জুগিয়েছেন।

ইউনেস্কো কর্তৃক ওয়ার্র্ল্ড হেরিটেজ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের প্রেক্ষাপট উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সেই দিন নানা জনে নানা পরামর্শ দিচ্ছে। আম্মা তখন তাঁকে একটি ঘরে বিশ্রামের সুযোগ করে দিয়ে মোড়া টেনে মাথার কাছে বসে বঙ্গবন্ধুকে কিছুক্ষণ চোখটা বন্ধ করে রাখতে বললেন।

আম্মা বললেন, ‘তোমার যা মনে আসে তাই তুমি বলবে। তুমি রাজনীতি করেছো, কষ্ট সহ্য করেছ, তুমি জান কি বলতে হবে। কারও কথা শোনার দরকার নাই।’

নীতির প্রশ্নে তিনি পিতার আদর্শকে ধারণ করে চিরদিনই আপসহীন উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে পড়ার সময় চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারিদের ন্যায্য আন্দোলনে অংশগ্রহণের জন্য জাতির পিতাকে ন্যূনতম জরিমানা এবং মুছলেখা দিয়ে ছাত্রত্ব টিকিয়ে রাখার শর্ত দিয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয় কতৃর্পক্ষ, যা তিনি মানেননি। তেমনি স্কুলজীবনে তাঁদের পরীক্ষায় (শেখ হাসিনা) আইয়ুব খাানের ওপর ২০ নম্বর ছিল। তিনি সেই ২০ নম্বর বাদ দিয়েই পরীক্ষা দিয়েছিলেন, যাতে করে তিনি ওই বিষয়ে ফেল পর্যন্ত করতে পারতেন।

ছাত্রলীগকে বঙ্গবন্ধুর হাতে গড়া সংগঠন হিসেবে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, একটি আদর্শিক সংগঠন হিসেবে গড়ে উঠতে হবে ছাত্রলীগকে। আদর্শের পতাকা ধারণের মাধ্যমেই দেশকে এগিয়ে নিতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীদের উদ্দেশ্যে বলেন, নিজেকে আদর্শবান নেতা হিসেবে যদি গড়তে পারো, দেশকে গড়তে পারবে। আর যদি সম্পদের লোভে গা ভাসিয়ে দাও তাহলে হারিয়ে যাবে, ভেসে যাবে।

বঙ্গবন্ধুর আদর্শ থেকে দূরে সরে যাওয়া অতীত ছাত্রনেতাদের কথা তুলে ধরে আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, ‘বহু ছাত্রনেতা চলে গেছে। কেউ বিএনপিতে গেছে, কেউ এখানে-সেখানে। তারা লোভে পড়েছিল, চলে গেছে। তারা কিন্তু আর কিছু দিয়ে যেতে পারেনি। কিন্তু যারা আদর্শ নিয়ে ধরে আছে, তারা দেশকে কিছু দিতে পেরেছে। এই কথাটা তোমরা মনে রাখবে।’

ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীদের মন দিয়ে পড়াশোনার করার আহ্বান জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, লেখাপড়া শিখতে হবে। সবচেয়ে বড় সম্পদ হচ্ছে শিক্ষা। ধন-সম্পদ চিরদিন থাকে না। কিন্তু শিক্ষা এমন একটা সম্পদ, যে সম্পদ কেউ কেড়ে নিতে পারে না।

ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীদের গৌরবময় ত্যাগের ইতিহাস তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যত আন্দোলন হয়েছে, সেখানে যদি শহীদের তালিকা দেখি- ছাত্রলীগের শহীদের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। তাদের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়েই বারবার অধিকার প্রতিষ্ঠা হয়েছে।

শেখ হাসিনা বলেন, আমার তো বয়স হয়ে গেছে, কাজেই তোমরাই হবে ভবিষ্যৎ। তোমরা নেতৃত্ব দেবে, কাজে তোমাদেরকেই আদর্শের পতাকা সমুন্নত রেখে, প্রগতির পথে, শান্তি পথে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশকে বিশ্ব দরবারে একটি উন্নত-সমৃদ্ধ-শান্তিপূর্ণ দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার যে লক্ষ্য আমরা নির্ধারণ করেছি তা বাস্তবায়ন করতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, এদেশের মানুষের অধিকারের জন্য সারাজীবন সংগ্রাম করে গেছেন আমার বাবা-মা। তারা জীবন দিয়ে গেছেন কিন্তু জাতির পিতার আদর্শের তো মৃত্যু নেই। সে আদর্শের পথ ধরেই আজকে আমরা বাংলাদেশকে উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছি। স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে আমরা উন্নিত হতে পেরেছি। আর সেই আদর্শ নিয়েই এদেশকে আমরা গড়ে তুলবো জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলা হিসেবে।

সূত্র- বাসস

আপনার মন্তব্য লিখুন............

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here