যেহেতু আমার কথা এসেছে, দায় আমি নিচ্ছি : মাশরাফি

যেহেতু আমার কথা এসেছে, দায় আমি নিচ্ছি : মাশরাফি

অনলাইন ডেস্ক : নিষেধাজ্ঞা কমিয়ে নিউজিল্যান্ড সফরের ওয়ানডে স্কোয়াডে রাখা হয়েছে সাব্বির রহমানকে। প্রধান নির্বাচক মিনহাজুল আবেদীন এর ব্যাখ্যায় বলেছেন, ‘এটি সম্পূর্ণভাবে আমাদের অধিনায়কের পছন্দ।’ এর পর থেকেই সমালোচনার তীরে বিদ্ধ মাশরাফি বিন মর্তুজা। কাল চট্টগ্রামের রেডিসন ব্লু হোটেলে নোমান মোহাম্মদকে দেওয়া এই একান্ত সাক্ষাৎকারে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেন তিনি। সেখানে ক্রুদ্ধ মাশরাফিকে যেমন পাওয়া গেছে, তেমনি হতাশ মাশরাফিকেও। কিন্তু দায় এড়ানোর সহজ পথ বেছে নেওয়া মাশরাফিকে পাওয়া যায়নি কিছুতেই।

প্রশ্ন : নিউজিল্যান্ড সিরিজের দল কেমন হলো?

মাশরাফি বিন মর্তুজা : খারাপ হয়নি। যারা ছিল, তারাই তো রয়েছে। এক-দুটি পরিবর্তন হয়তো এসেছে। আসলে বিশ্বকাপ মাথায় রেখে স্কোয়াডে খুব বেশি পরিবর্তনের সুযোগ নেই। এমনকি একাদশেও তেমন একটা না।

প্রশ্ন : আয়ারল্যান্ডে ত্রিদেশীয় সিরিজের আগেই তো বিশ্বকাপ স্কোয়াড ঘোষণার ডেডলাইন। চূড়ান্ত নির্বাচনের আগে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে তিনটি ওয়ানডেই তাহলে শেষ সুযোগ নয়?

মাশরাফি : প্রায় তাই। কিন্তু ক্রিকেটে শেষের পরও শেষ থাকে। ফর্মের ব্যাপার রয়েছে, ফিটনেসের ব্যাপার রয়েছে। নিউজিল্যান্ড সফরের দলটিই তাই বিশ্বকাপের স্কোয়াড—তা নিশ্চিতভাবে বলা যাবে না। তবে এখান থেকে খুব বেশি পরিবর্তন যে হবে না, তা বলতে পারেন।

প্রশ্ন : মাত্র এক সিরিজ আগেই ৩৪৯ রান করা ইমরুল কায়েস বাদ পড়েছেন নিউজিল্যান্ড সফরের স্কোয়াড থেকে। তাঁকে দুর্ভাগা মনে হয় না?

মাশরাফি : দুর্ভাগা মনে না হওয়ার কারণ নেই। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে যেভাবে খেলেছে, তা অবিশ্বাস্য। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে দুটি ম্যাচে সুযোগ পেয়ে রান করতে পারেনি। এরপর একাদশ থেকে বাদ গেল। এখন স্কোয়াড থেকে। অবশ্যই ওভাবে বিবেচনা করলে ইমরুল দুর্ভাগা।

প্রশ্ন : অফ স্পিনার নাঈম ইসলামকে কি নেওয়া হয়েছে বিশ্বকাপ ভাবনায়?

মাশরাফি : আমি ঠিক নিশ্চিত না। আপাতত নিউজিল্যান্ড সিরিজের কথা ভেবেই ওকে নেওয়া। নিউজিল্যান্ডের ব্যাটিং লাইনে পাঁচজনের মতো বাঁহাতি থাকবে। আমাদের তাই অফ স্পিনার খুব প্রয়োজন হবে। মিরাজের যদি কোনো সমস্যা হয়, তাহলে স্কোয়াডের ভেতরেই যেন একজন অফ স্পিনার থাকে, সে বিবেচনা থেকে নাঈমকে নেওয়া। কিন্তু বিশ্বকাপ নিয়ে এখনই বলা যাবে না। নিউজিল্যান্ডে নাঈম কেমন করে, তার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করছে।

প্রশ্ন : দলে সাব্বির রহমানকে নেওয়ার ব্যাখ্যায় প্রধান নির্বাচক বলেছেন, ‘আমি পরিষ্কার করে দিই, এটি সম্পূর্ণভাবে আমাদের অধিনায়কের পছন্দ।’ এ নিয়ে অনেক আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে। এরপর কি মিনহাজুল আবেদীনের সঙ্গে আপনার কথা হয়েছে?

মাশরাফি : না, এরপর কথা হয়নি।

প্রশ্ন : সাব্বিরের সঙ্গে কথা হয়েছে?

মাশরাফি : না।

প্রশ্ন : বোর্ড সভাপতি নাজমুল হাসানের সঙ্গে কথা হয়েছে?

মাশরাফি : পাপন ভাইয়ের সঙ্গে এ নিয়ে আমার কখনো কথা হয়নি। এত সামান্য জিনিস যে এত বড় হয়ে গেছে!

প্রশ্ন : সাব্বিরকে নেওয়ার ব্যাপারে আপনি নির্বাচকদের ঠিক কী বলেছিলেন?

মাশরাফি : আমার তো মতামত দেওয়ার চেয়ে বেশি কিছু করার নেই। অন্য অনেক দেশের নির্বাচক প্যানেলে অধিনায়ক থাকেন। আমাদের দেশে তা নেই। সাব্বিরকে আমি একক সিদ্ধান্তে দলে নিয়ে নেব, সে প্রশ্নই ওঠে না। আমি শুধু নিজের মতামত জানিয়েছিলাম।

প্রশ্ন : সাব্বিরকে কেন্দ্র করে যে সমালোচনা হচ্ছে, ভবিষ্যতে এমন কিছু এড়ানোর জন্য অধিনায়ককেও নির্বাচক প্যানেলের অংশ করা প্রয়োজন বলে মনে করেন?

মাশরাফি : দেখুন, আপনি যখন কোনো দায়িত্বে থাকবেন, তখন মেনে নিতে হবে যে, এখানে সমালোচনা হতে পারে। কারণ মানুষ মাত্রই ভুল করে। আবার এটিও সত্য, যে কাজ করে সে ভুল করে। কাজ না করলে তো ভুল হওয়ার সুযোগ নেই। আমি যদি নির্বাচক প্যানেলে থেকে সমালোচনার শিকার হতাম তাহলে অন্তত সান্ত্বনা পেতাম। কিন্তু এখন তো আমি তা নই। এখন যে নির্বাচক প্যানেলের অংশ কোচ, আবার অধিনায়ক তাঁর কথা ম্যানেজারকে জানান-এ প্রক্রিয়া চালু করেন চন্দিকা হাতুরাসিংহে। তিনি ঠিক করেছেন, তা বলা যাবে না। আবার তিনি ভুল করেছেন, তা-ও বলা যাবে না। তবে অধিনায়কের যা চাওয়ার, তা তিনি যদি সরাসরি নির্বাচক প্যানেলকে বলতে পারেন—তাহলে ভালো।

প্রশ্ন : অর্থাৎ, অধিনায়ককে নির্বাচক প্যানেলে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে?

মাশরাফি : আমার বিশ্বাস যে, ভবিষ্যতে এটি হবে। না হলে কাজ করা কঠিন হবে। কারণ শেষ পর্যন্ত ১১ জন নিয়ে মাঠে তো অধিনায়কই নামবেন। এখন মনে হতে পারে, দলের একাদশ তো ঠিকই আছে; বাকি চারজন কারা থাকবে—সেটি নির্বাচন করার জন্য অধিনায়কের দরকার নেই। কিন্তু অধিনায়কের জন্য ১৫ জনই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ যে কোনো সময় যে কাউকে প্রয়োজন হবে। অধিনায়কের নাম শুরুতে লেখা হলেও তার মতোই গুরুত্বপূর্ণ দলের ১৫তম সদস্য। এ কারণেই আমার কাছে মনে হয়, অধিনায়কের কথা শোনেন বা না শোনেন, নির্বাচক প্যানেলে অধিনায়ককে রাখা প্রয়োজন।

প্রশ্ন : যে সাব্বিরকে নিয়ে এত কিছু, তিনি তো আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অমন ভালো কিছু করতে পারেননি। তাহলে তাঁর ওপর আপনার এমন আস্থার কারণ কী?

মাশরাফি : একটি পরিষ্কার কথা বলছি। সাব্বিরের ওপর আমি আস্থা দেখিয়েছি, এ কারণে না যে তাকে নিতেই হবে। ওকে না নিলে দল চলবে না। তাহলে সাব্বির যে কদিন ছিল না, তত দিন দল চলত না। আসলে নিউজিল্যান্ড সফরের জন্য স্কোয়াডের ১৪ জনের নাম ঠিক হয়ে গেছে। এরপর ১৫ নম্বর সদস্যের জন্য যে নামগুলো দেখেছি, তখন মনে হয়েছে সাব্বিরকে নেওয়া যায়। কারণ বিশ্বকাপে সাত নম্বরে প্রতিপক্ষের সেরা পেস বোলারদের সামলানোর সামর্থ্য আমাদের অন্য ব্যাটসম্যানদের তুলনায় ওর বেশি। আমি তাই সামর্থ্যের কথা চিন্তা করে সাব্বিরের কথা বলেছি। যদি তা ভালো না লাগে, তাহলে নেবেন না। ও না থাকার পরও আমরা এশিয়া কাপ ফাইনাল খেলেছি; জিম্বাবুয়ে-ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সিরিজ জিতেছি। সাব্বিরকে ছাড়া চলেছে না? চলেছে তো। আর এর আগেও তো অনেককে নেওয়ার মত দিয়েছি; কিন্তু নির্বাচকরা নেননি।

প্রশ্ন : যেমন?

মাশরাফি : যেমন আবদুর রাজ্জাক। ২০১৬ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের সময় আমরা সিনিয়র ক্রিকেটাররা সবাই ওর কথা বলেছি। সাকিব বলেছে, তামিম বলেছে, মুশফিক বলেছে, রিয়াদ বলেছে; আমি তো অধিনায়ক বলেছিই। কিন্তু নেওয়া হয় সাকলাইন সজীবকে। এটি তো ওর প্রতিও অবিচার। কারণ এক ম্যাচ খেলানোর পর বলা হলো, ও এই চাপে বোলিং করতে পারে না। তাহলে ওকে দলে নিয়েছেন কেন? আজ হাতুরাসিংহে কোচ নেই বলে আমি এটি বলতে পারছি। উনি থাকলে বলতে পারতাম না। অধিনায়ক হিসেবে এমন অনেককে অনেকবার চেয়েছি আমি। পাইনি।

প্রশ্ন : কিন্তু নিষিদ্ধ থাকা ক্রিকেটার সাব্বিরকে নেওয়ার দায় আপনার ওপর পড়েছে; বিশেষত প্রধান নির্বাচকের অমন কথার পর?

মাশরাফি : নিষেধাজ্ঞা কমানো-বাড়ানোর সিদ্ধান্ত পুরোপুরি বোর্ডের। ওখানে আমার কিছু করার নেই। আর দায়ের কথা বলছেন? দায় এড়ানো তো পৃথিবীর সবচেয়ে সহজতম কাজ। এটি ঠিক কি না, ভেবে দেখা দরকার। এখন সাব্বিরকে দলে নেওয়ার ক্ষেত্রে দায় যখন আমার ওপর এসেছে, আমি দায় নিলাম। বাংলাদেশ ক্রিকেট আমার পারিবারিক দল না। আর সাব্বির আমার পারিবারিক মানুষও না; বরং রাজ ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তবে আমার কাছে মনে হয়, সাব্বিরের এই ঘটনায় কারো না কারো দায় নেওয়া উচিত। বাংলাদেশ ক্রিকেট এখন যে জায়গায় গিয়েছে, তাতে এত দায়িত্বহীন হলে হবে না। যেহেতু আমার কথা বলেছেন প্রধান নির্বাচক, আমি দায় নিতে রাজি। ঠিক আছে, ধরেই নিচ্ছি সাব্বিরকে আমার কথা অনুযায়ী দলে এনেছেন। আমিই ওকে নির্বাচন করেছি। কারণ দায় তো কাউকে না কাউকে নিতে হবে। দায় এড়িয়ে কত দিন চলবেন?

প্রশ্ন : মানে বলছেন, ‘আমি নির্বাচক না হয়েও সাব্বিরকে নির্বাচন করেছি।’

মাশরাফি : অবশ্যই। যেহেতু আমার কথা এসেছে, দায় আমি নিচ্ছি। সমস্যা নেই। বাংলাদেশের ক্রিকেট এত বড় জায়গা, সেখানে কেউ দায় নেবেন না কেন? আমি নিলাম। সূত্র : কালের কন্ঠ

আপনার মন্তব্য লিখুন............