শোক সংবাদের পরের ঘটনা

0
211
শোক সংবাদের পরের ঘটনা

তুষার অপু : মরা বাড়িতে ঢোকার সময় অন্তত বাঁশিতে টান দুটো না দিলেও পারতাম।

লাশকে গোসল করানো হচ্ছে; উঠানের এককোণে। বাড়ি ভর্তি মানুষ গিজগিজ করেছে। কান্নাকাটির রোল আর বিলাপ শুনছি আমি। সবকিছু আজকে কেমন যেন ওলট পালট লাগছে। এর আগেও অনেকবার মরা বাড়িতে গিয়েছি কিন্তু এমন লাগেনি কখনো। লাশ লোকটার মেয়েরা মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছে। আর স্ত্রী মূর্ছা গেছে বেশ কিছুক্ষণ। তেলপানি ডলছে কেউ একজন তার মাথায়। আমি খুঁজছি লাশ লোকটার ছোট মেয়ে- দোলাকে। কোথাও না দেখতে পেয়ে শেষে হেলালকে জিজ্ঞেস করলাম, আচ্ছা দোলা আসেনি? ও বললো- দোলাতো লাশের সাথেই আসছে। ক্যান দেখিস নাই? আমি শুধু নির্বিকার ভঙ্গিতে ‘ও…’ শব্দটা উচ্চারণ করলাম। প্রায় সাথে সাথেই হেলাল বললো- দোস্ত, আমার কিন্তু হেব্বি ধরছে! তোর ধরে নাই? আমি এবারও খুব উদাসভাবে শুধু ‘হুম’ বললাম।

হেলাল আর আমি একটা কাঁঠাল গাছের নিচে দাঁড়িয়ে দেখছি সবার কান্নাকাটি আর আহাজারি। লাশের স্বজনদের বিলাপ শুনে অনাত্মীয় অনেকেরই মন এবং চোখ যথাক্রমে দুঃখ এবং জলে ভারাক্রান্ত হয়ে উঠছে। কিন্তু আমাদের কেন বিশেষ কোনো অনুভূতি হচ্ছে না আজ? একটু নিচু স্বরে এসব নিয়েই কথা বলছিলাম আমি আর হেলাল। এমন সময় দেখি দোলা ঘর থেকে ছুটে বের হয়ে বাবার লাশের দিকে হাউমাউ করে কী যেন বলতে বলতে দৌড়াচ্ছে। তার পেছন পেছন খালাতো বোন উড়না হাতে ছুটছে। লাশ গোসল করানোর ওখান থেকে একজন মুরব্বী বললেন- ‘ওরে কেউ ধরো, আটকাও ওরে কেউ। ‘কয়েকজন চাচিগোছের মহিলা ইতোমধ্যেই কোলসাপ্টা দিয়ে দোলাকে ধরে মাটিতে বসে পড়েছে। চাচিদের কোল পেয়ে মেয়েটা নিশ্চিতে মূর্ছা যায়।

পুরো দৃশ্য গিলে খাওয়ার পর হেলাল বললো- ‘জানিস বাদল, অবিবাহিত মেয়েদের বাবা মারা গেলে বুক শুকিয়ে যায়। স্ফীত বুক কেমন রাতারাতি নিচু হয়ে যায়।’ আমি অন্যমনষ্কভাবে বলি– ও আচ্ছা! যদিও আমি অন্যমনষ্ক ছিলাম তবুও একবার মিলিয়ে নিতে আমার চোখ চলে যায় চাচিদের কোলে লেপ্টে থাকা উড়নাবিহীন দোলার বুকের দিকে। দেখে মনে হলো- ঘটনাটা সত্যিই। আমি আবার দেখি; এবার খুব খেয়াল করে দেখি। চোখদুটো ফুলে গোল হয়ে আছে। বন্ধ চোখ তবুও বোঝা যায় গতরাত থেকে কান্নার কোনো কমতি নেই তার চোখে।

গোসল শেষে লাশ নেওয়া হয় একটা মাদ্রাসার মাঠে। সেখানে জানাযার নামাজ শেষে পাশের গোরস্থানে দাফন করা হবে। এই ফাঁকে আমি আর হেলাল পুনরায় বাঁশিতে টান দিয়ে ওযু করে আসি।

অন্তত জানাযার নামাজে দাঁড়ানোর আগে বাঁশিতে টান দুটো না দিলেও পারতাম।

সামনে লাশ; খাটিয়াটা রোদের মধ্যে চাঁদর দিয়ে ঢাকা। কার্পেট জাতীয় মকমলের উপর মসজিদ মিনারের নক্সা করা দামি চাঁদর। আমরা তিন নাম্বার সারির মাঝের দিকে একজন আরেকজনের গাঁ ঘেঁষে দাঁড়ানো। আমাদের হাসি পাচ্ছে খুব। আমরা হাসি চেপে রাখতে গিয়ে এক বিদঘুটে ধরণের কাশির উৎপাদন করছি। কেউই সেদিকে ভ্রূক্ষেপ করছে না। সবাই জানাযাপূর্বক আনুষ্ঠানিকতা দেখছে গভীর মনোযোগে। লাশের গুণকীর্তণ হচ্ছে এখন। ইমাম সাহেব লাশের প্রসংশায় সপ্তমুখ। অথচ জীবিত অবস্থায় অনেকেই তাকে রাজাকার বলে গালিও দিতো।

কিন্তু আমাদের দু’জনের হাসির কারণটা কী? আমি হেলালের দিকে তাকাতেই দেখি হেলালও আমার দিকে আড়চোখে তাকাচ্ছে। হেলাল ফ্যাসফ্যাস কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে- ‘কিরে আমি যা ভাবছি তুইও কী তাই ভাবছিস?’ প্রথমে আমাদের চোখ তারপর ঠোঁট বেঁকে আসে ধীরে ধীরে; তুমুল হাসি পেয়ে যায়। এবার বেশ শব্দ করেই হেসে ফেলি; পাশে দাঁড়ানো এক মুরব্বি লানতের দৃষ্টিতে তাকায় আমাদের দিকে। দৃষ্টি দিয়েই যেন সে হাবিয়ার পথ নিশ্চত করে দেয় আমাদের। কানটা একটু খাঁড়া করলেই শুনতে পাই- কেউ বেয়াদব, কেউ ফাজিল, কেউ জানোয়ার বিশেষণে বিশেষায়িত করছে আমাদের। লজ্জায় কিছু না বলেই দু’জনে স্থান বদল করে ফেলি নিঃশব্দে।

আমরা বুঝে যাই গাঁজার নেশা চড়ে বসেছে আজ। স্থান বদলে নেওয়ার পর আর কোনো কানকথা শুনি না। মনে মনে ভাবি আর প্রার্থনা করি- আগে যা শুনেছি তা যেন সব মনের ভুলই হয়।

লেখক : তুষার অপু
মগবাজার, ঢাকা।

নিউজটি শেয়ার করুন :

আপনার মন্তব্য লিখুন............