শ্রম দিবসের ভাবনা

0
56
শ্রম দিবসের ভাবনা

কামাল সিদ্দিকী : আদিকাল হতে মানুষ কোন না কোন উপায়ে শ্রম দিয়ে আসছে। সেটা জীবন ধারনের জন্য হউক বা অন্য কোন প্রয়োজনে। মানুষেরই শ্রমের ঘামে আজকের এ সভ্যতার বিনির্মাণ। যিনি বিলাসবহূল শীততাপ নিয়ন্ত্রীত কক্ষে বসে কলম পিষছেন, তিনিও শ্রম দিচ্ছেন; আর যিনি খরতপ্ত দিনে ঘর্মাক্তদেহে পাহাড় কেটে মসৃণ সড়ক তৈরী করছেন, তিনিও শ্রম ঝরাচ্ছেন; কিন্তু এ দু’জনের শ্রমের মধ্যে বিস্তর পার্থক্য।

পরোক্ষে একজন প্রভূর ভূমিকায় ,অন্যজন নিছক ভৃত্ত। শিল্প বিল্পবের পূর্বে সামন্ত প্রভূরা কৃষিক্ষেত্রে ভূমিহীন কৃষককুলের সঙ্গে যে শঠতার আশ্রয় নিয়ে অভাগা কৃষকদের নানাভাবে নির্যাতন ও প্রতারিত করতেন; ঠিক তারই ধারাবাহিকতা অরক্ষিত থাকলো শিল্প বিপ্লবের পরেও। পার্থক্য শুধু কার্যক্ষেত্রের, আগে যেখানে ছিল খোলা মাঠ, দিগন্ত বিস্তৃত আকাশ। আজ তার পরিবর্তে বিশাল প্রাচীর বেষ্টিত লোহার কোলাপসিবল গেট, যান্ত্রিকভারে ন্যূব্জ ইট-সুড়কির ছাদ, ইলিক্ট্রক মেশিনারিজের গগন বিদারী গর্জণের মাঝে রক্ত-মাংসের মানুষের বেঁচে থাকার প্রাণান্তকর চেষ্টা।

সামন্তপ্রভুরাই নব্য পরিচয়ে আবির্ভুত হলেন। একজন মালিক; অপরজন শ্রমিক। সংঘাতআদিম, খোলস বিজ্ঞান-প্রযুক্তির। সস্তা শ্রমের বাজার খুঁজতে শিল্পায়াতদেশগুলো দরিদ্রতম দেশসমুহকে বাছাই করে নেয়। গ্লোবালাইজেশন বা মুক্ত বাজার অর্থনীতির ডামাঢোলে উন্নয়নশীল দেশ তাদের উৎপাদিত দ্রব্যসামগ্রীর বাজার হারাতে থাকে। সে সকল স্থান দখল করে নেয় পূঁজিবাদী দেশ। তারা শিল্পে অনগ্রসর দেশগুলোকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছে যে, জনসংখ্যা অধ্যুসিত দেশে অদক্ষ জনবল বেকারত্মের অন্যতম কারণ। দেশীয় শিল্পের স্থানীয় উদ্যোক্তার মাধ্যমে কখনোই মুক্ত বাজার অর্থনীতিতে টিকে থাকা সম্ভব নয়। তাই যদি ইপিজেড গড়ে বিদেশী শিল্পের প্রসার ঘটানো যায় তবে বেকারত্মের মত অভিশাপ হতে মুক্ত হওয়া যাবে। সরকার সে ফাঁদে পা দেয়। আদমজির মত বিশ্বখ্যাত জুট মিল বন্ধ করে দিয়ে সেখানে ইপিজেড করা হলো শুধু শ্রমিক অসন্তোষ্টির দোহাই দিয়ে। আমার দেশের হাজার হাজার দক্ষ শ্রমিক বেকার হয়ে পড়ল। বিদায়ী শ্রমিকদের নব ইপিজেডে আত্মিকরণ করা হয়েছে এমন তথ্য জানা নেই। আর শ্রমিকদের বঞ্চনার মূলে মালিকদের ভূমিকা প্রত্যক্ষ। তবে পরক্ষে কারা অনুঘটকের ভুমিকা পালন করছে তা অনুমেয়। রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বেশীর ভাগে শ্রমিক অসন্তোষের কারন ঘটিয়ে শ্রমিক অসন্তোষ জিঁয়ে রেখে রাজনৈতিক ফায়দা লোটার চমকপ্রদ ইতিহাস আমাদের জানা আছে ।

চলমান ইস্যুগুলো ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার জন্য কিভাবে জুটমিল ও গার্মেন্টসগুলোতে আগুন লাগিয়ে শ্রমিক পুড়িয়ে মারা হয় তার ন্যাক্কার জনক দৃষ্টান্ত আমাদের দেশে ভুরিভুরি রয়েছে।

সাভারে রানা প্লাজা ধ্বসের নির্মমতাতো আমরা এখনো প্রত্যক্ষ করছি। একটি ঝুকিঁপুর্ণ ভবণে কিভাবে শত শত শ্রমিককে জোর পুর্বক অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে নিছক রাজনৈতিক বিবৃতি প্রদান করে তৎকালীন স্বরাস্ট্র মন্ত্রী বেরোধীদলকে ঘায়েল করার অপচেষ্টা করলেন। মালিক বেচারা আই ওয়াশের জন্য বন্দি হলেন। কিন্তু মন্ত্রীর মিথ্যাচারের বিচার হলো না। আজো নিহত-আহত শ্রমিকরা তাদের যথাযথ ক্ষতিপূরণ পায়নি। শ্রমিক সংগঠনগুলোও এ ব্যাপারে তেমন তৎপর বলে মনে হচ্ছে না। আর ট্রেড ইউনিয়ন বা বার্গেনিং এজিন্সিগুলোতো মালিক পক্ষের তৃতীয় হাত হিসেবে কাজ করে। তথাকথিত শ্রমিক নেতাদের ভন্ডামি এখন দিবালোকের মত স্পষ্ট। এ সকল নেতারা মালিক পক্ষের সঙ্গে হাত মিলিয়ে শ্রমিক নির্যাতনে পর্দার অন্তরালে কাজ করছেন বলে বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। এ ব্যাপারে গার্মেন্টস্ ফ্যাক্টরি ও ফিশারিজ কোম্পানীগুলোর শ্রমিক নেতাদের অগ্রনী ভুমিকা নজর কাড়ছে বেশি। কারণ এ সকল কোম্পানীর অধিকাংশ শ্রমিক নারী।

অভিযোগ আছে যে, কোম্পানীতে উৎপাদিত নিম্নমানের পোষাক রফতানীর লক্ষে বা কাজের অর্ডার পেতে বায়ারদের মনোস্তুষ্টির জন্য শ্রমিক নেতাদের স্মরনাপন্ন হন কোম্পানী হোল্ডারগন। মোটা অঙ্কের কন্ট্রাকের বিনিময়ে শ্রমিক নেতারা কোম্পানীতে কর্মরত নারী শ্রমিকদের দেহদানে বাধ্য করে থাকেন। এছাড়া ইন্স্যুরেন্সের টাকা ম্যাচুউরড্ হওয়ার পূর্বে অর্থ দাবির জন্য মালিক শ্রমিক আঁতাত ও কোন নতুন ঘটনা নয় ।

সবচেয়ে মজার ব্যাপার হচ্ছে কোন কোম্পানীতে একদিনও একমূহুর্তের জন্য চাকরী না কর্রে এদেশে শ্রমিক নেতা সাজা যায়। শ্রমিকদের আত্ম বঞ্চনাও শ্রমিক নির্যাতনের শামিল বলে মনে করি। আট ঘন্টা শ্রম আওয়ারের জন্য যে দাবি আজ থেকে দু’শো বছর আগে শিকাগো শহরে উঠেছিল, রক্তপাতের বিনিময়ে সে দাবি বাস্তবায়িত হয়েছে ।

কিন্তু আমার দেশে তা নিছক কাগজে কলমে এখনো গার্মেন্টসসহ বিভিন্ন ফ্যক্টরিতে প্রায় চৌদ্দ ঘন্টা শ্রম দিতে হয়। এসব শ্রমিকদের অধিকাংশই নারী শ্রমিক। তারা ঘুম-বিশ্রামতো দূরের কথা আহারের সময়টুকুও পায় না। যে চাকরী তাকে দেওয়ার কথা উন্নত খাদ্য-পুষ্টি ও স্বাস্থ্য সম্মত আবাসন; সেই চাকরীর ওভারলোড তাকে আরো বেশী পুষ্টিহীন করে তোলে। অধিকাংশ নারী শ্রমিক লিকোরিয়ায় আক্রান্ত। মাসান্তে যে অর্থ তারা পায় তার সিংহভাগ ব্যয় হয় ঘরভাড়ায় আর ডাল-চাল ক্রয়ে। শ্রীহীন এসকল নারীর পান্ডুর চেহারাই বলে দেয় তাদের জীবন মানের হাল অবস্থা। সবচেয়ে দুঃখ পাই তখন, যখন দেখি-এরা অতি কষ্টার্জিত টাকা নিম্নমানের পসরায় অর্থহীন ব্যয় করে।

আর এর মূল কারণ হলো-অশিক্ষিত, স্বল্প শিক্ষিত বা অর্ধ শিক্ষিত এ সকল শ্রমিকদের সংসার জীবন পরিচালানার জন্য কোন পরামর্শভিত্তিক সংস্থা নেই-নেই কোন তদারকি ব্যবস্থা। শ্রমিকদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের জন্য যে বিজ্ঞান সম্মত পরিকল্পনা দরকার তার কোন ব্যবস্থা নেই। অনিবার্য সত্য হলো- সুষ্ঠু ও সু-পরিকল্পনা ছাড়া শ্রমিকদের অবস্থার উন্নয়ণ সম্বভ নয়। যার জন্য প্রয়োজন শিল্প সংস্থা সম্পর্কিত সকল পক্ষের আন্তরিক সদিচ্ছা ও প্রচ্ষ্টে।

তাই শ্রম দিবস আসে। শ্রম দিবস যায়। কিছু সেমিনার-সিম্পজিয়াম, আলোচনা সভা, কিছু মিটিং-মিছিল, দর্শনীয় র‌্যালি। রাষ্ট্রপতি-প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেত্রীর বাণী। শ্রমিক সংগঠনগুলোর অধিকার আদায়ের দৃপ্ত শপথ গ্রহণ। জাতীয় পত্রিকায় বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ আর অধুণা সংযোজন ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ায় গভীর রাতের আগুন ঝরা টকশোগুলোতে শ্রমজীবি মানুষের অবস্খা পরিবর্তনের চটকদার যুক্তি পাল্টা যুক্তির মাধ্যমে চরম পান্ডিত্য জাহিরের আত্মতৃপ্তির ঢেকুর তোলার চিরাচরিত শ্রমদিবস পালনের এক ঘেয়েমি এখন ভূক্তভোগি শ্রমিকদের আকর্ষণ করে না, তাদের মনে আশার আলোও জ্বালে না ।

তারা জানে এগুলো সব লোক দেখানে কথাসর্বস্ব টু-পায়েস কামানোর কসরত ছাড়া আর কিছুই না। এ ধরণের দিবস পালনের দ্বারা তথাকথিত কিছু মানুষের অবস্থার পরিবর্তন হয়; কপাল পোড়া শ্রমিকরা যে তিমিরে আছে সেই তিমিরেই থাকে। তাই লোক দেখানো এ সকল দিবসের তাৎপর্য বলা যায় দিন দিন ম্লান হয়ে আসছে। আর এর মূল কারণ হল-কর্তা ব্যক্তিদের কথা আর কাজের মিল না থাকা। শ্রমিক সংগঠন, শ্রমিক নেতা, মালিকপক্ষ, সরকার কেউই এ ব্যাপারে দায় এড়াতে পারেন না।

সুতরাং শ্রম দিবস তখনই যথার্থভাবে মূল্যায়িত হবে যখন মালিক-শ্রমিক-রাজনৈতিক দল তথা দাতা গোষ্ঠির সম্মিলিত সিদ্ধান্ত ও তার বাস্তাবায়ন হবে।

লেখক- কামাল সিদ্দিকী
কবি ও কলামিস্ট।

নিউজটি শেয়ার করুন :

আপনার মন্তব্য লিখুন............