সড়ক পরিবহন আইন সংশোধনের দাবি; পরিবহন শ্রমিকদের কর্মবিরতি যাত্রী, চালক ও কলেজছাত্রীর মুখে-গায়ে পোড়া মবিল

0
69
অনলাইন ডেস্কঃ সড়ক পরিবহন আইন সংশোধনসহ ৮ দফা দাবিতে গতকাল রবিবার সকাল ৬টা থেকে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন সারাদেশে ৪৮ ঘন্টার কর্মবিরতি পালন করছে। রাজধানীর রাস্তায় ব্যক্তিগত গাড়ি ছাড়া কোনো যানবাহন চলতে দেখা যায়নি। নগরীতে সরকারি পরিবহন সংস্থা বিআরটিসির বাসও ছিল তুলনামূলকভাবে কম।  পরিবহন শ্রমিকরা যেমন গণপরিবহন চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে, তেমনি চলছে না পণ্যবাহী কোনো পরিবহনও।
কর্মসূচির প্রথম দিন গতকাল সকাল থেকেই রাজধানীর বিভিন্নস্থানে বিশেষ করে বাস টার্মিনালগুলোর আশপাশে কর্মবিরতির সমর্থনে পরিবহন শ্রমিকদের উচ্ছৃঙ্খল আচরণ চোখে পড়ে। যাত্রী ও চালকের মুখে, কাপড়ে পোড়া মবিল লাগিয়ে দেওয়ার ঘটনাও ঘটে। এমন অনাকাঙ্খিত ঘটনা থেকে রক্ষা পায়নি কলেজ শিক্ষার্থী ও রোগী বহনকারী অ্যাম্বুলেন্সও। ছাড় পায়নি সচিবালয়ের গাড়িও। বিভিন্ন স্থান থেকে ছেড়ে আসা দূরপাল্লার বাস, ট্রাক পথে আটকে দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে বলে খবর পাওয়া গেছে।
এ দিকে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, এই মুহূর্তে সড়ক পরিবহন আইন পরিবর্তন করে শ্রমিকদের দাবি মেনে নেওয়া সম্ভব না। অন্যদিকে ধর্মঘটের নামে পরিবহন শ্রমিকরা নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করলে তা সহ্য করা হবে না বলে হুঁশিয়ার করেছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত। তিনি বলেন, যেকোনও ধরনের নৈরাজ্য শক্তহাতে দমন করা হবে। আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, সড়ক পরিবহন আইন না বুঝেই পরিবহন শ্রমিকরা ঘর্মঘট করছেন। তিনিও শ্রমিকদেরকে ধর্মঘট প্রত্যাহারের আহবান জানান।
অপরদিকে আইন সংশোধনের জন্য সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় শ্রমিকদের সঙ্গে না বসা পর্যন্ত সারা দেশে পরিবহন শ্রমিকদের কর্মবিরতি চালিয়ে যাওয়ার কথা বলেছেন সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ওসমান আলী। তিনি বলেন, ‘আমাদের দাবি নিয়ে আমরা সরকারের সঙ্গে আলোচনা করতে আগ্রহী। যদি দাবি পূরণ করা হয়, তাহলে আমরা কর্মসূচি প্রত্যাহার করব।’ তিনি বলেন, ‘আমরা কি আওয়ামী লীগ বিদ্বেষী লোক? ২০১৩-১৪ সালে কি আমরা জীবন দিয়ে বিরোধীদলের অবরোধ ঠেকাই নাই? কারও সঙ্গে আমাদের বিরোধ নাই।’
অন্যদিকে, পণ্য পরিবহন মালিক শ্রমিক ঐক্য পরিষদের আহবায়ক মকবুল আহমেদ বলেন, ‘আমরা বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের ডাকা কর্মবিরতি সমর্থন করি না। কারণ যেদিন আইনটি পাস হয় সেদিন শ্রমিক ও মালিক সংগঠনের দুই শীর্ষ নেতা (নৌ পরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খান ও স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মশিউর রহমান রাঙ্গা) সংসদে উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু তারা সেদিন কোন ধরনের প্রতিবাদ করেননি।’ তিনি বলেন, ‘আমরা জনগনকে কষ্ট দেওয়ার এই কর্মসূচি ঘৃণাভরে প্রত্যাখান করি।

পোড়া মবিল নিয়ে পরিবহন শ্রমিকদের নৈরাজ্য

গতকাল সকালের দিকে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে মোটরসাইকেলের চালক, ব্যক্তিগত গাড়ির চালক কিংবা আরোহীদের মুখেও পোড়া মবিল মেখে দেয় শ্রমিকরা। যাত্রী নিয়ে সিএনজিচালিত একটি অটোরিকশা যাত্রাবাড়ীর কাজলা এলাকায় আসতেই পরিবহন শ্রমিকরা হামলে পড়ে তাতে। যাত্রীদের টেনেহিঁচড়ে চালককে নামিয়ে চড়থাপ্পড় মারতে শুরু করে।  এসময় অটোরিকশাটি উল্টে দিয়ে চাবি নিয়ে যায় এক পরিবহন শ্রমিক। এ অবস্থায়  হাউমাউ করে কাঁদতে থাকেন চালক। এ অবস্থায় নেতা গোছের এক শ্রমিক এসে অটোরিকশার চালকের পিঠে হাত দিয়ে ধমক দিয়ে বলেন, ‘যা, সোজা গ্যারেজে চলে যা, দুই দিন রাস্তায় নামবি না। এই কর্মবিরতি কার জন্য? তোগো জন্যই তো, দুই দিন কষ্ট কর, আজীবন আরামে গাড়ি চালাবি।’ প্রায় একই সময় যাত্রাবাড়ীতে সচিবালয়ের কর্মকর্তাদের নিয়ে ডেমরা থেকে আসা দুটি বাসের যাত্রীদের নামিয়ে দিয়ে বাস দুটির চাবি নিয়ে যায় শ্রমিকরা। এছাড়া সকাল ৯টার দিকে নারায়ণগঞ্জের শিমরাইল মোড়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিবের গাড়ি আটকে দেয় শ্রমিকরা।
পরিবহন শ্রমিকদের এমন আচরণের ব্যাপারে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেড়ারেশনের সাধারণ সম্পাদক ওসমান আলী বলেন, এই ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের এরই মধ্যে চিহ্নিত করা হয়েছে। তিনি বলেন, যে ব্যক্তি ঘটনাটি ঘটিয়েছে আমরা তাকে চিহ্নিত করেছি। তাকে প্রাথমিকভাবে ফেডারেশন থেকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটি গঠন করে দেওয়া হয়েছে। কমিটি তদন্ত করে দেখবে এর পেছনে কোনও ইন্ধন আছে কিনা। তবে তিনি ওই ব্যক্তির নাম বলতে পারেননি। ওসমান আলী আরো বলেন, কোনও যাত্রী বা চালককে সামাজিকভাবে হেয় করার অধিকার কারো নেই। আমাদের আন্দোলনে তো এমন হওয়ার কথা না। আমাদের আন্দোলনে কোনও অবরোধ হবে না। রাস্তায় ব্যারিকেড হবে না। তৃতীয় পক্ষ সুবিধা নিতে পারে এমন আশঙ্কায় আমরা এগুলো পরিহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমাদের আন্দোলন হবে শান্তিপূর্ণ। কিন্তু কারা, কি জন্য এটা ঘটিয়েছে, সেটা আমরা তদন্ত করছি।

কলেজ ছাত্রীদের গায়েও কালি

গতকাল দুপুরে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের সাইনবোর্ড এলাকায় নারায়ণগঞ্জে সরকারি মহিলা কলেজের ছাত্রীদের বহন করা বাসেও হামলা চালায় পরিবহন শ্রমিকরা। এ সময় তারা বাসচালক ও ছাত্রীদের গায়ে কালি লেপে দেয়। শিক্ষার্থীরা জানায়, দুপুর ১২টার দিকে সাইনবোর্ড এলাকা পার হওয়ার সময় হঠাত্ শ্রমিকরা বাসটি থামিয়ে চালককে মারধর করে ও তার মুখমণ্ডলসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে কালি লেপে দেয়। পরে এ ঘটনার প্রতিবাদ করলে কয়েকজন ছাত্রীকেও কালি লেপে দেয় শ্রমিকরা। তারা গালিগালাজও করে। পরে বাসের কয়েকটি গ্লাস ভাঙচুর করে বাসে থাকা ৩৮ জন ছাত্রীর সবাইকে নামিয়ে দেয় শ্রমিকরা। একই সময়ে সিদ্ধিরগঞ্জে রোগী না থাকা একটি অ্যাম্বুলেন্সে কালি লেপে দেয় শ্রমিকরা।

ধর্মঘট প্রসঙ্গে নৌ পরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খান

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের কার্যকর সভাপতি, নৌ পরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খান জানিয়েছেন, তিনি এ বিষয়ে কিছুই জানেন না। গতকাল দুপুর ১২টার দিকে সচিবালয়ের নিজ দপ্তর থেকে বের হওয়ার সময় নৌ মন্ত্রীকে ঘিরে ধরেন সাংবাদিকরা। কর্মবিরতির ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ আন্দোলন সম্পর্কে আমি কিছুই জানি না। যে বিষয়ে কিছু জানা নেই, সে বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাই না।’ শ্রমিকদের কর্মবিরতি প্রত্যাহারে  কোনো নির্দেশনা দেবেন কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি এ বিষয়ে এখন কোনো মন্তব্য করব না।’
পরিবহন শ্রকিদের এই কর্মবিরতিকে ‘নৈরাজ্য’ হিসেবে উল্লেখ করে সমালোচনা শুরু হয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।

মালিক সমিতির নেতৃবৃন্দ যা বলেন

বাংলাদেশ ট্রাক কাভার্ডভ্যান মালিক সমিতির নেতা রুস্তম আলী খান বলেন, শ্রমিক ফেডারেশন যে কর্মসূচি পালন করছে তাতে আমাদের পক্ষ থেকে, মালিক সংগঠনের পক্ষ থেকে সমর্থন জানানো হয়েছে। আশা করছি সরকার বিষয়টি বিবেচনায় নেবে। পাস হওয়া আইনের কিছু ধারা অবশ্যই সংশোধন জরুরি।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হোসেন বলেন, কর্মবিরতির নামে অচাবলস্থা তৈরি করা হয়েছে, যাত্রীসাধারণকে মারধর, যেসব পরিবহন চলছে তাতে ভাঙচুর করা হয়েছে। ব্যক্তিগতও গাড়িও চলতে বাধা দেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, পরিবহন মালিকপক্ষের ইন্ধনেই জনগণকে জিম্মি করে, সরকারকে বেকায়দায় ফেলে শ্রমিক ফেডারেশন এমন আন্দোলন করে আসছে। অথচ সংসদে পাস হওয়া এই আইন তৈরিতে সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি ও সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনেরই প্রতিনিধিত্ব ছিল। যাত্রীদের প্রতিনিধি ছিল না। তাদেরই গড়া আইনের বিরোধিতা করে আন্দোলন হাস্যকর।
যাত্রীদের ভোগান্তির বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মীর রেজাউল আলম বলেন, গণপরিবহন না থাকায় ভোগান্তিতে পড়েছেন যাত্রীরা। সীমাবদ্ধতা থাকায় পুলিশের পক্ষ থেকে যাত্রীদের সহযোগিতায় আমাদের কিছু করার নেই। তবে শ্রমিকদের কর্মবিরতির কারণে সড়কে যেন কোনো অরাজকতা তৈরি না হয় সেটা আমরা পর্যবেক্ষণ করছি।
উল্লেখ্য, এর আগে গত ১২ অক্টোবর শ্রমিক ফেডারেশন সিদ্ধান্ত নেয়, সড়ক পরিবহন আইন সংস্কারসহ ৮ দফা দাবি ২৭ অক্টোবরের মধ্যে পূরণ না হলে ২৮ অক্টোবর থেকে দুদিনের কর্মবিরতিতে যাবেন শ্রমিকরা।
শব্দপাতা ডট কম/তুষার অপু 
নিউজটি শেয়ার করুন :

আপনার মন্তব্য লিখুন............